Global Header Bottom
ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

পর্ব-১

ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

মার্কেটিংয়ের মূল কাজ হলো ভোক্তাকে সন্তুষ্ট করা। মার্কেটিংয়ের যে কোনো কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে ভোক্তা বা ক্রেতা। যদিও সকল ক্রেতা ভোক্তা নয়, আবার সকল ভোক্তাও ক্রেতা নয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যিনি ক্রেতা তিনিই ভোক্তা। শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে অনেক কিছুই আমরা ক্রয় করি যেগুলো আমরা ভোগ করি না। অর্থাৎ ক্রেতা আমরা হলেও ভোক্তা আমরা নই। আবার অনেক কিছু আমরা ভোগ করলেও সেগুলো আমাদের কেনা নয়। পণ্য যাঁর দ্বারাই কেনা হোক না কেন ভোক্তার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হয়। কারণ ভোক্তা যদি পণ্য ভোগ বা ব্যবহার করতে না পারেন তাহলে ওই পণ্য কেনার স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। একজন ক্রেতা যখন কোনো পণ্য ক্রয় করেন তখন তিনি ভোক্তার বিভিন্ন বিষয়গুলো বিবেচনা করেই পণ্য কেনেন। যেমন একজন বাবা বা মা যখন তাঁর শিশুসন্তানের জন্য বেবিফুড ক্রয় করেন তখন কোন বেবিফুডটি ভালো হবে সেটা বিবেচনা করেই তিনি কিনছেন। আবার ওই একই ক্রেতা যখন তাঁর বয়স্ক পিতার জন্য একটি পাঞ্জাবী কিনছেন তখনো তিনি তাঁর পিতার বিভিন্ন বিষয়গুলো বিবেচনা করে পাঞ্জাবী কিনছেন। আমরা মার্কেটিংয়ের বহুল উচ্চারিত একটি কথা জানি, ক্রেতারা পণ্যকে বিবেচনা করেন অনেকগুলো সন্তুষ্টির সমাহার হিসেবে। এ কারণে ক্রেতারা কোনো পণ্য কেনার সময় পণ্যের কোয়ালিটি, ফিচারস, সাইজ, ডিজাইন, কালার, ওয়েট, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ড, ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি, আফটার সেলস সার্ভিস, প্রাইস, অ্যাভেইলাবিটি সহ আরও নানা বিষয় বিবেচনা করেই একটি পণ্য কেনেন। একজন ক্রেতা একটি পণ্য কেনার সময় এই যে নানান বিষয় বিবেচনা করেন সেটা করার মূল কারণ ভোক্তা। অর্থাৎ ভোক্তার কথা বিবেচনা করেই ক্রেতা এই বিষয়গুলো বিবেচনা করেন। একজন ধনী ক্রেতা কোনো পণ্য কেনার সময় দাম নিয়ে ভাবেন না। তাঁর কাছে ব্র্যান্ড, কোয়ালিটি, ফিচারস গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন গরীব ক্রেতার কাছে পণ্যের মূল্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেতা কার জন্য পণ্য কিনছেন সেটাই মার্কেটারকে বিবেচনায় নিতে হবে। মার্কেটারকে এখানে মার্কেট সেগমেন্টেশনের নানা বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

একজন মার্কেটারকে ক্রেতাদের ক্রয় সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া নিয়েও ভাবতে হবে। এক সময় আমাদের দেশের প্রায় সকল পরিবারেই ক্রয় সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতেন পরিবারের গৃহকর্তা তথা বাবা বা পিতা। এর পাশাপাশি পরিবারে বড় ছেলে সন্তান থাকলে তাঁরাও সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করত। কিন্তু এখন সেখানে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেক পরিবারেই এখন বাবার পাশাপাশি মা ও কন্যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কোনো কোনো পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাবার চেয়ে মা এবং কন্যাদের প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে কারণও রয়েছে। মেয়েরা এখন পড়ালেখায় আগের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর। নারীদের ক্ষমতায়ন তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া আর্থ-সামাজিক নানা কারণ এখানে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। কোনো কোনো ক্রয় সিদ্ধান্তে পরিবারের সদস্যদের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করছে পিয়ার গ্রুপ বা বন্ধুবান্ধব। ফলে মার্কেটারকে ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং ওই সিদ্ধান্তে কার কতটুকু ভূমিকা সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। আমাদের পরিবারগুলোতে এখন নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি চলমান। পরিবারের সকল সদস্যদের সমন্বয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণ এখন অনেকটা কমে গেছে। ছেলেমেয়েরা বড় হলে ওরা ওদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করছে। এমনকি বিয়ে-সাদী করার সময়ও নিজেদের মতো করে জীবনসঙ্গী বেছে নিচ্ছে। সময়ের পরিক্রমায় এই যে পরিবর্তন এগুলো মার্কেটারকে বুঝতে হবে। মার্কেটারকে ভোক্তাদের প্রতিটি বিষয়ের প্রতি এবং প্রতিটি পরিবর্তনের প্রতি তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে।

আমেরিকায় সফট ড্রিংকস এর অনেক বড় একটি বাজার রয়েছে। কোনো কোনো ব্র্যান্ড শুধু বয়স্কদের জন্য তৈরি। বাজারে অনেকগুলো ব্র্যান্ড জনপ্রিয়। নতুন একটি ব্র্যান্ড বাজারে আসার পূর্বে ক্রেতাদের ওপর একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সট (এসডব্লিউওটি) অ্যানালাইসিস করার সময় গবেষকেরা অন্যান্য ব্র্যান্ডের মধ্যে দুটি সীমাবদ্ধতা খুঁজে পেলেন। কোনো কোনো ব্র্যান্ডের বোতলের কর্ক বা ছিপি বেশ শক্তভাবে আটকানো থাকতো। ফলে খোলা সহজ ছিল না। বয়স্ক ক্রেতাদের মধ্যে অনেকেই আর্থারাইটিজ রোগে আক্রান্ত থাকার কারণে তাঁদের পক্ষে কর্ক বা ছিপি খোলা সহজ ছিল না। দ্বিতীয় সমস্যাটি ছিল পরিমাণ নিয়ে। প্রতিটি বোতলে যে পরিমাণ সফট ড্রিংকস থাকতো তা ছিল বয়স্কদের জন্য বেশি। কারণ অনেকে নানা রোগে আক্রান্ত থাকার কারণে তাঁদের শরীর সবটুকু পান করার জন্য উপযুক্ত ছিল না। পরিমাণ মতো পান করে কেউ বাকীটুকু ফেলে দিতেন না। সবটুকুই পান করতেন। এটা ছিল তাঁদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নতুন ব্র্যান্ডটি যখন পরিমাণ কমিয়ে এবং কর্ক বা ছিপি সহজে খোলা যায় এমনভাবে সফট ড্রিংকস বাজারে ছাড়লো তখন তাঁদের পক্ষে বাজারে একটি অবস্থান তৈরি করে নেওয়া সম্ভব হলো। ক্রেতাদের জন্য কোনটি ভালো, কোনটি খারাপ এটা মার্কেটারকে বুঝতে হবে। পাশাপাশি এটাও বুঝতে হবে ক্রেতাদের আচরণ কোন পণ্যের জন্য কোন সময় কেমন করছে এবং কেন করছে।

(চলবে)

ভাইস চ্যান্সেলর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক চেয়ারম্যান মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer