Global Header Bottom
উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা

পর্ব-৮

উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা

উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা

বিজনেস প্ল্যান এর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো এইচআর প্ল্যান। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায় অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে এই জায়গাটিতে সমস্যা রয়েছে। “রাইট পারসন ফর দ্য রাইট রুল অ্যাট দ্য রাইট টাইম”- এইচআর জগতের প্রবাদস্বরূপ এই বাক্যটির মর্মবাণী যেন অনেক প্রতিষ্ঠানে খুঁজেই পাওয়া যায় না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত এই বাক্যটির বাস্তব প্রয়োগ হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পাবে না। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা সম্ভব হবে না। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে মাঝারী এবং বড় সকল শ্রেণির উদ্যোক্তাদের মধ্যেই এইচআর প্ল্যানিংয়ে সমস্যা রয়েছে। এই একটি মাত্র সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। আবার কখনো প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

একটি প্রতিষ্ঠানে বেশ কয়েকটি ডিপার্টমেন্ট বা বিভাগ থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি ক্ষুদ্র হয় তাহলে সেখানে সকল বিভাগের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে। তবে বড় প্রতিষ্ঠানে যত ধরনের বিভাগ বা ডিপার্টমেন্ট থাকে তার আদলেই ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে দেখা যায়। বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেলস, মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, এইচআর, ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টস, আরআন্ডডি, কমপ্লায়েন্স, সাপ্লাইচেইন, প্রোডাকশন, ল, কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট এর মতো ডিপার্টমেন্টগুলো দেখতে পাওয়া যায়। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে এত ধরনের ডিপার্টমেন্ট না থাকলেও কিছু ডিপার্টমেন্ট থাকে। ডিপার্টমেন্ট কম বা বেশি যা-ই হোক না কেন কর্মী নিয়োগে কী ধরনের নিয়ম-রীতি অনুসরণ করা হবে তার একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন থাকতে হবে। আমাদের দেশে এমনিতেই যোগ্য লোকের প্রচন্ড অভাব। তারপরে যদি স্বজনপ্রীতি এবং অনৈতিকভাবে কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা থাকে তাহলে সেখানে প্রতিষ্ঠানের লোকসান ছাড়া লাভ হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

এইচআর প্ল্যানিংয়ে আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের একটি ভুল করে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে নিয়োগ দিলেই কর্মী ঠিক মতো কাজ করতে পারবে। বাস্তবতা হলো কর্মীকে নিয়োগ দিলেই তাঁর নিকট থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট পাওয়া সম্ভব নয়। একজন কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার পর তাঁর জন্য ট্রেনিং, মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের কালচারের সাথে মেশার জন্য সময় দিতে হবে। কর্মীর সুযোগ সুবিধার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। কাজ করার জন্য কর্মীকে যথেষ্ট পরিমাণে সাপোর্ট দিতে হবে। এই বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলে সেখানে কর্মীর নিকট থেকে শতভাগ আউটপুট আশা করাটাই বোকামী। এইচআর প্ল্যানিংয়ে এই বিষয়গুলো থাকতে হবে। আমাদের দেশে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়াকে প্রতিষ্ঠানের খরচ মনে করে। অথচ এটা একটি উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ। কর্মী চলে যাবে এই ভয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করে না। এগুলো সবই আমাদের উদ্যোক্তাদের সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতা আমরা যদি অতিক্রম না করতে পারি, আমাদের উদ্যোক্তারা যদি ভেঙ্গে ফেলতে না পারে তাহলে এখানে ভালো কর্মীর সংকট থেকেই যাবে। এই সংকটের কারণে বাজারে ভালো কর্মীর সংখ্যা খুবই কম। প্রতিষ্ঠানের এইচআর প্ল্যান এমনভাবে করতে হবে যেন প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে চাহিদা মতো কর্মী খুঁজে বের করতে পারে। কর্মী খুঁজে বের করলেই হবে না। তাঁদের জন্য উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কর্মীদের ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

আমাদের দেশে মানসম্পন্ন মানবসম্পদের সংকট কতটা তীব্র সেটা বুঝানোর জন্য একটি উদাহরণই যথেষ্ট। পুরো পৃথিবীর অনেক নামকরা ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, পলো শার্ট সহ আরও অনেক কিছুই এদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে। এখান থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নেওয়া পণ্যে উচ্চ মুনাফা যোগ করে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মার্কেটিং করছে। আমরা সারা পৃথিবীর বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর পোশাক বানিয়ে দিচ্ছি। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের কোনো গ্লোবাল ব্র্যান্ড নেই। আমরা শুধু অর্ডার কালেকশন করছি। আর ওই অর্ডার অনুযায়ী তৈরি করে সেগুলো ক্রেতাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই যে ব্যর্থতা এর অন্যতম কারণ যেখানে যে ধরনের কর্মী প্রয়োজন সেগুলোর অধিকাংশই আমাদের নেই।

বিজনেস প্ল্যান এর মধ্যে এইচআর প্ল্যানকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা প্রয়োজন। এইচআর প্ল্যান যদি ঠিক থাকে তাহলে প্রতিষ্ঠানে সঠিক জায়গায় সঠিক কর্মী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়। প্রতিষ্ঠান যদি এই কাজটি করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সমস্যার কোনো অন্ত থাকে না। প্রতিষ্ঠানের সেলস ডিপার্টমেন্টের কর্মীদের বলা হয় ফ্রন্ট লাইনের সোলজার। আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সেলস নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। কেন সন্তুষ্ট নয়? কারণ প্রত্যাশিত বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি কেন হচ্ছে না এর কারণ খুঁজতে গেলে কম্বলের লোম বাছাইয়ের মতো অবস্থা হয়। যেমন, বিক্রি কম হওয়ার কারণ হতে পারে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি হয়নি। ডিসট্রিবিউশন চ্যানেল ঠিক মতো কাজ না করলে বিক্রি কম হতে পারে। সেলস টিমের সদস্যরা যোগ্যতাসম্পন্ন না হলে বিক্রি কম হতে পারে। প্রমোশন অ্যাক্টিভিটিজে ভুল থাকলে বিক্রি কম হতে পারে। প্রাইসিং পলিসির মধ্যে ভুল থাকলে বিক্রি কম হতে পারে। প্যাকেজিং নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ থাকলে বিক্রি কম হতে পারে। নানা কারণেই পণ্য বিক্রি কম হতে পারে। কারণ যেটাই হোক না কেন সেখানে কর্মীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কাজ সঠিকভাবে করার জন্যই এইচআর প্ল্যান যথাযথ হওয়া প্রয়োজন।

(চলবে)

চেয়ারম্যান, মার্কেটিং বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer