Global Header Bottom
প্রতিষ্ঠানে স্ট্র্যাটেজিক এইচআর কেন প্রয়োজন?

পর্ব- ৬

প্রতিষ্ঠানে স্ট্র্যাটেজিক এইচআর কেন প্রয়োজন?

প্রতিষ্ঠানে স্ট্র্যাটেজিক এইচআর কেন প্রয়োজন?

আমি যখন একজন কর্মীর নিকট থেকে বেস্ট আউটপুট প্রত্যাশা করব তখন অবশ্যই আমাকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ওই ধরনের একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশে সমস্যা হলো পরিবেশ তৈরি না করেই আমরা প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করি। গত পর্বেও উল্লেখ করেছিলাম প্রতিষ্ঠানের এইচআর ডিপার্টমেন্টের কাজ শুধু কর্মী নিয়োগ, বেতন, প্রমোশন, বদলি, শাস্তি, আর ছাঁটাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের এইচআর ডিপার্টমেন্টের কাজের পরিধি অনেক ব্যাপক এবং গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের এইচআর ডিপার্টমেন্ট যদি ওই কাজগুলো না করে সেটা ভিন্ন কথা। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রত্যাশা অনুযায়ী হবে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় তাহলে এইচআর ডিপার্টমেন্টকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। স্ট্রাটেজিক এইচআর প্র্যাকটিস করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে যখন স্ট্রাটেজিক এইচআর প্র্যাকটিস হবে তখন সেখানে কর্মপরিবেশে ভিন্নতা চলে আসবে। কর্মীদের অ্যাংগেজমেন্ট বৃদ্ধি পাবে। কর্মীরা স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করবে।


একজন কর্মী যেকোনো কারণে একদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকতেই পারে। ওই দিন তাঁর অফিসে আসার ইচ্ছা না করতেই পারে। এরপরেও যদি ওই কর্মী অফিসে আসে তাঁর নিকট থেকে প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ আউটপুট তো দূরের কথা, অর্ধেক আউটপুটও পাবেনা। কারণ কর্মী কাজ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। এ অবস্থায় ওই কর্মী যদি এইচআর ডিপার্টমেন্টে ফোন করে তাঁর সমস্যার কথা জানায় এবং এইচআর থেকে তাঁকে একদিনের ছুটি দেওয়া হয় তাহলে পরবর্তী দিন তিনি অফিসে এসে তাঁর সর্বোচ্চ আউটপুট দেওয়ার চেষ্টা করবে। কারণ তাঁর মনে তখন দুটি বিষয় কাজ করবে। প্রথমত, তাঁর মধ্যে অনুশোচনা কাজ করবে এই ভেবে একদিন তিনি অফিসে আসেননি। দ্বিতীয়ত, অফিসে এ ধরনের নিয়ম থাকার কারণে তাঁর মনে ভালোলাগা কাজ করবে। ফলে পরবর্তী যেদিন তিনি অফিসে আসবেন সেদিন তাঁর কাজের গতি বদলে যাবে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্র্যাকটিস থাকলে তো কর্মীরা কারণে-অকারণে যখন তখন ছুটি ভোগ করবে। এই সন্দেহ অমূলক নয়। তবে যে প্রতিষ্ঠান স্ট্রাটেজিক এইচআর প্র্যাকটিস করবে ওই প্রতিষ্ঠানের কলেবর ছোট হবে না। বড় এবং ভালো প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের প্র্যাকটিস করবে। ফলে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া সেখানে অযোগ্য লোকের চাকরি পাওয়ার সুযোগ কম। যাঁরা চাকরি পাবে তাঁদের মধ্যে পেশাদারত্ব মনোভাব থাকবে। ফলে কোনো কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকার কথা চিন্তা করবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে কোনো কঠিন নিয়মের মধ্যে আটকে রেখে সর্বোচ্চ আউটপুট কখনো পাওয়া সম্ভব নয়। কর্মীদের ওপেন এনভায়রনমেন্ট দিতে হবে। আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানে তেমনই একটি কালচার ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি।


প্রতিষ্ঠান যখন কর্মীদের অ্যাংগেজ করতে পারে তখন কর্মীরাও সব সময় প্রতিষ্ঠানের কথাই চিন্তা করে। একজন কর্মী প্রতিষ্ঠানের জন্য দশ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করছে। যদি আট ঘন্টা ডিউটি আওয়ার হয় তাহলে আরও অন্তত দুই ঘন্টা যাতায়াতের জন্য ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ সর্বমোট দশ ঘন্টা সময় চাকরির কারণেই ব্যয় করছে। বাকি চৌদ্দ ঘন্টার মধ্যে একজন কর্মী যদি প্রতিদিন সাত বা আট ঘন্টা ঘুমান তাহলে তাঁর হাতে অবশিষ্ট সময় থাকে ছয় থেকে সাত ঘন্টা। এই ছয় থেকে সাত ঘন্টা সময় তাঁকে পরিবারের পেছনে এবং অন্যান্য কাজে ব্যয় করতে হয়। একজন কর্মীকে যখন প্রতিষ্ঠানের সাথে নিবিড়ভাবে আবিষ্ট করা যায় তখন ওই কর্মী শুধু অফিস চলাকালীন সময়ে অফিসের কাজ করেন না এবং অফিস নিয়ে ভাবেন না। বরং তাঁর হাতে যে ছয় থেকে সাত ঘন্টা সময় থাকে সেটাও তিনি পরোক্ষভাবে অফিসের জন্য ব্যয় করেন। তিনি খেতে বসলেও অফিসের ভাবনা ভাবেন। কারণ অফিস তখন তাঁর কাছে মনে হয় একটি ড্রিম অফিস। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার জন্য ফ্যামিলি থেকেও সাপোর্ট দেওয়া হয়। ফ্যামিলিও বুঝতে পারে কোনো কারণে চাকরি চলে গেলে এমন প্রতিষ্ঠান পাওয়া কষ্টকর হবে।


বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে কর্মীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের অ্যাংগেজমেন্ট ভালো থাকলে প্রতিষ্ঠানের রিটার্ন ৩০ ভাগ পর্যন্ত বেশি আসে। এই ডাটাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রতিষ্ঠান অ্যাংগেজমেন্টের গুরুত্ব বুঝতেই পারেনা। ফলে সেখানে কর্মী অ্যাংগেজমেন্টের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। আমরা চেষ্টা করছি অ্যাংগেজমেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্র্যাকটিসগুলো করা খুব কঠিন। কারণ আমাদের মধ্যে পেশাদারত্ব মনোভাবের বড় অভাব। অথচ এই একই কাজ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণফোনের মাদার কোম্পানি টেলিনর বিশ্বের ১৪ টি দেশে ব্যবসা করছে। অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের জন্য ক্যাশ কাউ। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এদেশে কি পরিমাণ মুনাফা করছে। মুনাফা করার পেছনে অন্যতম কারণ হলো প্রতিটি কোম্পানি সিস্টেম ডেভেলপ করেছে। ইনফ্রা-স্ট্রাকচার ডেভেলপ করেছে। ফলে কোন দেশ থেকে সিইও বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর আসছেন সেটা ব্যবসার জন্য কোনো সমস্যা তৈরি করছে না। অন্যদিকে অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের দেশের অনেক কোম্পানি প্রথম প্রজন্ম থেকে দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে যাওয়ার পর সোজা হয়ে আর দাঁড়াতেই পারছে না।


(সমাপ্ত)

ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর: এবি ব্যাংক পিএলসি । সাবেক সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট । এবং ব্যাংকার্স ক্লাব অব বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer