রিভার ট্যুরিজম
বদলে দিতে পারে অনেক কিছু
বাংলাদেশ নদীবিধৌত দেশ। সমগ্র ভ‚খন্ড জুড়ে জালের ন্যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর, পুকুর আর জলাশয়। একসময় এদেশে ১ হাজার ৩৬০টি ছোট-বড় নদী-নালা, খাল-বিল ছিল। বর্তমানে এই সংখ্যা ৫শ এর ঘরে নেমে এসেছে। পৃথিবীর অনেক দেশ শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য খাল কেটে নদীর পানি, এমনকি সমুদ্রের পানি শহরের ভেতর নিয়ে এসেছে। আমরা এর বিপরীত কাজটি করেছি। একের পর এক নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট করে তা জমিতে রূপান্তর করেছি। তবুও আমাদের পরিচয় নদীমাতৃক দেশ হিসেবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন নদী বিধৌত ভ‚খন্ড নেই। অধিক সংখ্যক নদ-নদী থাকার কারণে এদেশে রিভার ট্যুরিজমের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। রিভার ট্যুরিজম হতে পারে আমাদের অর্থনীতির একটি বড় সহায়ক শক্তি। আবার তা হতে পারে সৌন্দর্যের নতুন উপকরণ। হতে পারে দেশের নতুন পরিচয়। কিন্তু, তার জন্য প্রয়োজন সঠিক কর্মপরিকল্পনা, দিকনির্দেশনা।
পর্যটন একটি শিল্প। তাই, এটিকে শিল্প হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেকোনো শিল্প গড়ে তুলতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে যে ধরনের নার্সিং প্রয়োজন, এই শিল্পের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ আছে বলে আমাদের কিছু করার নেই তা ভাবার সুযোগ নেই। এ কারণেই এখানে একটি সমন্বিত কর্মকৌশল প্রয়োজন। এই শিল্পের উন্নয়নের জন্য পর্যটন, নৌ-পরিবহণ মন্ত্রনালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো যদি একযোগে কার্যক্রম হাতে নেয় তাহলে সেখান থেকে ভালো ফলাফল আসতে বাধ্য। আমরা যদি সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় রিভার ট্যুরিজমের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি তাহলে সেটা হবে বিশ্বের ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান বা ভ্রমণের তীর্থস্থান।
একটু কল্পনার জগতে চলুন। একটি জাহাজের কথা ভাবুন। সুন্দর ও আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত জাহাজ। প্রতিটি রুমে এসি’র ব্যবস্থা। রয়েছে টয়লেট। জাহাজের মধ্যে উইন্ডমিল, সোলার সিস্টেম, আর্ন্তজাতিক মানের কমপ্লায়েন্স, লন্ড্রি সিস্টেমসহ যা যা প্রয়োজন তার সব আয়োজনই রয়েছে। এ ধরনের একটি জাহাজ যদি সদরঘাট বা নারায়নগঞ্জ থেকে সুন্দরবন যাতায়াত করে তাহলে কেমন হবে? জাহাজে ঘুরে সুন্দরবন দেখা যাবে। আধো আলো, আধো অন্ধকারে বাঘ দেখা যাবে। ভরা পূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় জাহাজ ভেসে বেড়াবে। নদী থেকে তাজা মাছ ধরে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে, এমন ভাবনাগুলো আমাদের দেশে অসম্ভব নয়। আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ডসহ উন্নত দেশগুলোতে আমাদের দেশের অনেক নাগরিক বাস করছে। তাঁদের নিকট যদি এ ধরনের জাহাজে ভ্রমণের কথা প্রচার করা হয়, তাঁরা যখন দেশে ঘুরতে আসবে রিভার ট্যুরিজম উপভোগ করতে ভুল করবে না। শুধু প্রবাসীরা নয়, এদেশের মানুষও এখন ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। অনেকে সুযোগ পেলেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। তাঁরাও এ ধরনের রিভার ট্যুরিজমের সুযোগ গ্রহণ করবে। বিদেশিরাও এ ধরনের ভ্রমণে উৎসাহী হবে। রিভার ট্যুরিজমের একটি বড় সুবিধা হলো এর মতো নির্মল পরিবেশ আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমরা যাঁরা শহরে বাস করি তাঁদের প্রতিদিন গাড়ির কালো ধুঁয়া সেবন করতে হয়। সাথে রয়েছে পরিবেশ দূষণের নানা উপকরণ। রিভার ট্যুরিজম কিছুটা সময়ের জন্য বা কয়েকদিনের জন্য দিতে পারে নির্মল বায়ু সেবনের অপূর্ব সুযোগ।
পাকিস্তান আমলে সদরঘাট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত নৌপথে যাতায়াতের সুযোগ ছিল। স্বাধীনতার পরেও অনেক বছর পর্যন্ত চালু ছিল। কিন্তু আশির দশকের শেষের দিকে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে, এই অঞ্চলের রেলপথ ও সড়ক পথে ক্রমাগতভাবে চাপ বেড়ে চলেছে। নৌপথে যাতায়াত খরচ কম। রিভার ট্যুরিজমের ক্ষেত্রেও তা কার্যকর হতে পারে। এখনো ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিন পর্যন্ত জাহাজ চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। এ ধরনের ভ্রমণের ক্ষেত্রে কেটামেরাম ধরনের জাহাজ হওয়া বাঞ্চণীয়। এই জাহাজগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো সহজে পানিতে ডুবে না। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি জাহাজগুলো ওজনে বেশ হালকা হয়। ফলে, গতিবেগ থাকে বেশি। দুটি জাহাজের মধ্যে পাশাপাশি ঘষা লাগলেও ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া প্রভৃতি দেশে এ ধরনের জাহাজ বেশি দেখা যায়। জাহাজগুলো নির্মাণের সময় নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হয়। গতিবেগ বেশি হলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ঘন্টায় ১২ থেকে ১৪ নটিক্যাল মাইল বেগে চলাচল করতে পারবে। এর গতিবেগ আরও বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে সম্ভব নয়। কারণ এই জাহাজ বেশ ঢেউ সৃষ্টি করে। গতিবেগ বেশি থাকলে ঢেউয়ের কারণে ছোট ছোট নৌকাগুলো ডুবে যাবে। এছাড়া, নদীর পাড় ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
শুধু সুন্দরবন নয়। কক্সবাজারও নয়। রিভার ট্যুরিজমের জন্য সমগ্র বাংলাদেশ হতে পারে ভ্রমণের তীর্থস্থান। ভাটি অঞ্চলে বড় বড় হাওর রয়েছে। বর্ষাকালে তা সমুদ্রে রুপ নেয়। এ ধরনের জায়গার দৃশ্য কখনো লিখে বা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। এ সকল দৃশ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করার একমাত্র উপায় হলো সরেজমিনে তা অবলোকন করা। বর্ষাকালে যমুনার কথা চিন্তা করুন। চারিদিকে পানির জয়জয়কার ভাব। এমন দৃশ্য যে কারও মন মুহূর্তের মধ্যে ভালো করে দিতে পারে। বর্ষাকালে সমগ্র দেশ যেন পানিতে ভাসতে থাকে। ওই সময় কেটামেরাম জাহাজে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। শাপলা-শালুকের দেশ বাংলাদেশ। হাজার রকম পাখির দেশ বাংলাদেশ। বর্ষায় এ দেশ অপরুপ সাজে সজ্জিত হয়। আমাদের কবি সাহিত্যিকরা লেখার মধ্য দিয়ে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। সেই সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করতে পারি রিভার ট্যুরিজমের মধ্য দিয়ে।
ঢাকা শহরেও রিভার ট্যুরিজমের সুযোগ রয়েছে। ৪০০ বছর আগে ঢাকাকে লন্ডনের সাথে তুলনা করা হতো। লন্ডন টেমস নদীর তীঁরে অবস্থিত। ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীঁরে। ওই সময় ঢাকা নদীবিধৌত অঞ্চল ছিল। ঢাকার ওই জৌলুস আর নেই। কিন্তু, সরকার যদি মনে করে ঢাকার হারিয়ে যাওয়া গৌরব আবার ফিরিয়ে আনবে তা অসম্ভব নয়। সবটুকু না হলেও অনেকটাই সম্ভব। ১০০ বা ২০০ সিটের ওয়াটার বাস দিয়ে ঢাকার চারপাশে যদি ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা করা যায় তাহলে মানুষ তা উপভোগ করবে। তবে, মানুষের চাহিদা আর সে অনুযায়ী সেবা প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ড্রেজিংয়ের বিকল্প নেই। যদি তা সঠিকভাবে করা হয় তাহলে হয়তো মানুষ ঢাকার চারপাশ ঘুরে দেখার সুযোগ পাবে। রিভার ট্যুরিজমের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। রিভার ট্যুরিজম শুধু অজানা গন্তব্যে ঘুরে বেড়ানো বা অদেখাকে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আপন ঠিকানায় যাতায়াতের সময়ও রিভার ট্যুরিজমের আনন্দ উপভোগ করা যায়। যাঁদের বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে তাঁরা অনেকেই নৌপথে যাতায়াত করেন। আবার অনেকে নৌপথ এড়িয়ে চলেন। যাঁরা নৌপথকে এড়িয়ে চলেন তাঁদের একটি বড় অংশ মনে করেন চলাচলরত নৌযানগুলো নিরাপদ নয়। বাস্তবিকঅর্থেও তাই। কারণ, ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম রুলস অনুযায়ী এ ধরনের নৌযানগুলো ২৫-৩০ বছর পর চলাচলের উপযোগী থাকে না। কিন্তু, আমাদের দেশে তা অনুসরণ করা হয় না। এছাড়া, জাহাজগুলোর নির্মাণ কৌশল নিয়েও মানুষের মনে ভীতি কাজ করে। চলাচলরত জাহাজগুলো যদি কেটামেরাম প্রকৃতির হয় তাহলে মানুষ ভ্রমণকে উপভোগ করার সুযোগ পাবে। অনেকে শখ করেও দক্ষিণাঞ্চল ঘুরতে যাবে।
আমাদের মতো স্বল্পোন্নত যেকোনো দেশকে সামনে অগ্রসর হতে হলে অল্প কয়েকটি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। বিনিয়োগের বড় অংশ বেসরকারি খাত থেকে আসে। আমাদের দেশেও মোট বিনিয়োগের প্রায় ৯০ ভাগ বেসরকারি খাত থেকে এসেছে। কিন্তু, প্রতিটি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণের কাজটি প্রাথমিকভাবে সরকারকেই করতে হয়। এ সকল কাজের জন্য বেসরকারি খাত সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে। মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু, সরকারের পক্ষে সকল খাতের উন্নয়ন একযোগে সম্ভব নয়। গরীব দেশ হিসেবে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সরকার যদি সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও সকল খাতের উন্নয়নের চেষ্টা করে তাহলে প্রকৃতঅর্থে কোনো খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাত নির্বাচন করতে হয়। এদেশে ট্যুরিজমের জন্য প্রকৃতিগতভাবেই আমরা একটু সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছি। তাই এই খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সরকারের পক্ষে সহজ হবে। সরকার যদি এই খাতের উন্নয়নে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে তাহলে রিভার ট্যুরিজম তথা আমাদের দেশের সামগ্রিক পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন মাইলফলক তৈরি করতে পারে। হতে পারে অনেকের কর্মসংস্থান। হতে পারে মানুষের মাইন্ড রিফ্রেশমেন্টের জন্য অভাবনীয় সুযোগ।
ওয়াসিম চৌধুরী
উন্নয়নকর্মী