Global Header Bottom
পৃথিবীর বুকে এক স্বপ্নময় অনুভূতির গল্প

ফিলিপ আইল্যান্ড, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া, পেঙ্গুইন প্যারেড

পৃথিবীর বুকে এক স্বপ্নময় অনুভূতির গল্প

পৃথিবীর বুকে এক স্বপ্নময় অনুভূতির গল্প

ফিলিপ আইল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের এক অপূর্ব দ্বীপ। মেলবোর্ন শহর থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত কবিতা। আজও চোখ বন্ধ করলে আমার হৃদয়ের গভীরে ভেসে ওঠে সেই সন্ধ্যা, সেই সমুদ্র, সেই পেক্সগুইনের দল আর পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের সঙ্গে কাটানো এক অনন্য অভিজ্ঞতার স্মৃতি।


সেদিন বিকেলে আমরা যখন বাসে করে ফিলিপ আইল্যান্ডের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন থেকেই চারপাশের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করছিল। সবুজ প্রান্তর, ছোট ছোট বাড়ি, দূরে মহাসাগরের নীল জলরাশি সবকিছু যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো লাগছিল।


আমাদের বাসে জাপান, কোরিয়া, আমেরিকা, ফ্রান্স, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পর্যটক ছিলেন। যদিও আমার পরিবারের কেউ আমার সঙ্গে ছিল না, কিন্তু সেই ভ্রমণে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর নানা দেশের এই মানুষগুলোই যেন আমার পরিবার হয়ে গেছে। সবাই হাসছিল, ছবি তুলছিল, গল্প করছিল, মানুষের ভাষা আলাদা হলেও আনন্দের ভাষা যে এক, সেটা সেদিন গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম।


ফিলিপ আইল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত আকর্ষণ হলো ফিলিপ অ্যাইল্যান্ড পেঙ্গুইন প্যারেড। এখানে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট প্রজাতির পেঙ্গুইন “লিটল পেঙ্গুইন” বা “ফেয়ারি পেঙ্গুইন” বসবাস করে। এদের উচ্চতা সাধারণত মাত্র ৩০ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় এক কেজির মতো। ছোট্ট শরীর, নীলাভ পালক আর হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হয় যেন ছোট ছোট ভদ্রলোক কোট পরে হেঁটে যাচ্ছে।


সন্ধ্যা নামার আগে আমরা সমুদ্রের ধারে গ্যালারিতে বসেছিলাম। প্রচÐ ঠান্ডা বাতাস বইছিল। দক্ষিণ মহাসাগরের বিশাল ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ে সাদা ফেনায় ভরে দিচ্ছিল চারপাশ। সেই দৃশ্য এতটাই সুন্দর ছিল যে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি নিজেই যেন শিল্পীর তুলিতে ছবি এঁকেছে। আমি তখন কাঁপছিলাম শীতে, কিন্তু একইসাথে হৃদয় ভরে যাচ্ছিল এক অদ্ভুত আনন্দে।


ঠিক তখনই ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠ ভেসে এলো। তিনি অসাধারণ আবেগ আর মায়া নিয়ে পেঙ্গুইনদের জীবনের গল্প বলছিলেন। কিভাবে তারা প্রতিদিন ভোরে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়, কিভাবে সন্ধ্যা নামলে আবার দল বেঁধে তীরে ফিরে আসে সবকিছু এত সুন্দরভাবে বর্ণনা করছিলেন, মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো জীবন্ত ডকুমেন্টারির অংশ হয়ে গেছি। তিনি বলছিলেন, পেঙ্গুইনরা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ডিম পাড়ে। মা-বাবা দুজনই ডিমে তা দেয়। ছোট ছোট বাচ্চারা যখন ডিম ফুটে বের হয়, তখন মা-বাবা পালা করে সমুদ্রে যায় খাবারের সন্ধানে। আবার ফিরে এসে নিজেদের সন্তানদের খাওয়ায়। এই ছোট্ট প্রাণীদের মধ্যেও যে এত ভালোবাসা, এত দায়িত্ববোধ থাকতে পারে তা দেখে আমি সত্যিই আবেগাপ্লæত হয়ে পড়েছিলাম।


যখন সন্ধ্যা আরও গভীর হলো, তখন হঠাৎ দেখা গেল সমুদ্রের ঢেউয়ের ভেতর ছোট ছোট কালো ছায়া নড়ছে। একটু পরেই দল বেঁধে পেঙ্গুইনরা তীরে উঠতে শুরু করল। হাজার হাজার মানুষ নিঃশব্দে সেই দৃশ্য দেখছিল। কেউ কথা বলছিল না। সবাই যেন প্রকৃতির সেই পবিত্র মুহূর্তটিকে সম্মান জানাচ্ছিল। পেঙ্গুইনদের হাঁটার ভঙ্গি এতটাই মজার এবং সুন্দর ছিল যে আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল ছোটবেলার গল্পের বইয়ের পাতা থেকে চরিত্রগুলো বাস্তবে চলে এসেছে। ছোটবেলায় “পেঙ্গুইনের দেশ” নিয়ে গল্প পড়েছিলাম। তখন কল্পনা করতাম বরফের দেশে ছোট ছোট পাখিরা হাঁটছে। কিন্তু সেদিন সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়ে আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়েছিল।


আমি চারপাশে শুধু ক্যামেরার ফ্ল্যাশ দেখতে পাচ্ছিলাম। সবাই ভিডিও করছিল, ছবি তুলছিল। আমিও অসংখ্য ছবি আর ভিডিও ধারণ করছিলাম, কারণ বুঝতে পারছিলাম এই মুহূর্ত হয়তো জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না। ফিলিপ আইল্যান্ড শুধু পেঙ্গুইনের জন্য বিখ্যাত নয়। এই দ্বীপটির ইতিহাসও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৭৯৮ সালে ইউরোপীয় নাবিক জর্জ ব্যাস দ্বীপটি আবিষ্কার করেন এবং পরে নিউ সাউথ ওয়েলসের গভর্নর আর্থার ফিলিপের নামে এর নাম রাখা হয় “ফিলিপ আইল্যান্ড”। দ্বীপটির আয়তন প্রায় ১০১ বর্গকিলোমিটার। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থ সর্বোচ্চ ৯ কিলোমিটার। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা খুব শান্ত এবং প্রকৃতিনির্ভর। অনেকেই মাছ ধরা, কৃষিকাজ এবং পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ছোট ছোট ক্যাফে, সি-ফুড রেস্টুরেন্ট আর স্থানীয় দোকানগুলো দ্বীপটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। সেখানে গিয়ে আমি স্থানীয় ফিশ অ্যান্ড চিপসের স্বাদ নিয়েছিলাম।


ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে গরম খাবারের সেই স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি। ফিলিপ আইল্যান্ডের আরেকটি সৌন্দর্য হলো এর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থা। এখানে শুধু পেঙ্গুইন নয়, সিল, কোয়ালা, নানা প্রজাতির পাখি এবং সামুদ্রিক প্রাণীও দেখা যায়। প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করার জন্য অস্ট্রেলিয়ান সরকার এবং স্থানীয় মানুষ অত্যন্ত সচেতন। পর্যটকদেরও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। পেঙ্গুইনদের ছবি তুলতে ফ্ল্যাশ ব্যবহার নিষিদ্ধ, কারণ এতে তাদের চোখের ক্ষতি হতে পারে। সেদিন আমি অনুভব করেছিলাম, প্রকৃতির সামনে মানুষ কত ক্ষুদ্র, অথচ কত সৌভাগ্যবান। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের সঙ্গে বসে একই সৌন্দর্য উপভোগ করা, একই মুহূর্তে আবেগে ভেসে যাওয়া, এটা সত্যিই অসাধারণ এক অনুভ‚তি ছিল। আমার পাশে বসা একজন জাপানি পর্যটক ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বলছিলেন, “দিস ইজ ম্যাজিক্যাল”। আমি তার কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত ছিলাম। সত্যিই, সেটি ছিল এক জাদুকরী সন্ধ্যা।


ফিলিপ আইল্যান্ডের আকাশে তখন অসংখ্য তারা জ্বলছিল। সমুদ্রের গর্জন, ঠান্ডা বাতাস, পেঙ্গুইনের ডাক আর মানুষের নিঃশব্দ বিস্ময় সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন পৃথিবীর বাইরের কোনো সুন্দর জগতে চলে এসেছি। সেদিন আমি উপলব্ধি করেছিলাম, ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়। ভ্রমণ মানুষের হৃদয়কে বড় করে, পৃথিবীকে নতুনভাবে চিনতে শেখায়। আমি একা গিয়েছিলাম, কিন্তু একা ফিরিনি। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের হাসি, ভালোবাসা আর আন্তরিকতা যেন আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।


আজও যখন সেই ছবি দেখি, ভিডিও দেখি, তখন হৃদয়টা কেমন যেন ভরে ওঠে। মনে হয় আবার ফিরে যাই সেই সমুদ্রের ধারে, আবার শুনি ধারাভাষ্যকারের আবেগঘন কণ্ঠ, আবার দেখি ছোট ছোট পেঙ্গুইনের দল কোট পরা ভদ্রলোকের মতো হেঁটে যাচ্ছে নিজেদের ঘরের দিকে। ফিলিপ আইল্যান্ড আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি আমার জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি, যা হৃদয়ের গভীরে চিরকাল গেঁথে থাকবে।


মো. জাকির হোসেন সরকার

জেনারেল ম্যানেজার

এসিআই, পিএলসি

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer