Global Header Bottom
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

গত সংখ্যার পর

প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগ চেষ্টা করে প্রত্যেক কর্মীকে সত্যিকার অর্থে সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে, প্রতিষ্ঠানে তাঁদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে, তাঁদের দ্বারাই চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানের ও কর্মীদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য। তবে এ কাজটি মানবসম্পদ বিভাগ খুব সহজে করতে পারে না। কারণ মানবসম্পদ বিভাগকে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ আমাদের মতো দেশগুলোতে আরও বড় করে দেখা হয়। কেননা, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়। বিশ্বায়নের ধারণাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বায়নের কারণে সমগ্র বিশ্বকে একটি গ্রাম হিসেবে চিন্তা করা হয়। বিশ্বায়নের যেমন কিছু ভালো দিক আছে। আবার এর খারাপ দিকও আছে। খারাপ দিকগুলোই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। কোম্পানিগুলো এদেশে এসেছে কারণ, কম মূল্যে শ্রম পাওয়া যায়। ফলে দেখা যায় কোম্পানিগুলো অধিক মুনাফার সুযোগ পায় এবং শুধু মুনাফার দিকেই ধাবিত হয়। একদিকে কোম্পানিগুলো মুনাফা লুটে নেয়, আবার অন্যদিকে কমপ্লায়েন্স এর নামে বিভিন্ন শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নীতির মধ্যে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কোম্পানিগুলো যদি মুনাফার পরিমাণ কমিয়ে খরচ একটু বাড়িয়ে দেয় তাহলে এদেশের শ্রমিকেরা আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারে। সামাজিক বৈষম্য কমে আসে। কর্মর্স্পহা আরও বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ সুগম হয়। কোনো বহুজাতিক কোম্পানি যখন চীনে যায় তখন এক ধরনের মজুরি চিন্তা করে, আর বাংলাদেশে আসলেই মজুরি কমানোর চিন্তা করে। তখন বিষয়টিকে বৈষম্য ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় না। অথচ এই কোম্পানিগুলো যদি সিএসআর এর আওতায় কিছু কাজ করে তাহলে তা মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোম্পানিগুলো যে কোনো মূল্যে তাদের মুনাফাকে সর্বোচ্চ করতে চায়।


বিশ্বায়নের আরেকটি নেগেটিভ দিক হলো মেধা পাচার। বিশ্বায়নের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধন হয়েছে। এই উন্নতি যাতায়াত ব্যবস্থায় যেমন হয়েছে তেমনি হয়েছে তথ্য আদান প্রদানেও। ঘরে বসেই আজ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার খবর নেওয়া যাচ্ছে। মানুষ তাঁর কর্মস্থল হিসেবে সারা দুনিয়াকেই বেছে নিয়েছে। ফলে যোগ্যদের জন্য সারা বিশ্ব আজ উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এ কারণে মেধাবীরা আজ তাঁদের কর্মস্থল শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। যে দেশে সর্বাধিক সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান সেখানেই ছুটে যাচ্ছে। এ অবস্থায় একদিকে যেমন আমাদের দেশের মেধাবীরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আবার অন্যদিকে অন্য দেশের লোকজন এদেশে এসে কাজ করছে। এক্ষেত্রে দু‘ভাবেই আমাদের দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। প্রথমত, মেধাবীরা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে দেশ ক্রমান্বয়ে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। যার কুফল দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বায়নের কারণে বিভিন্ন দেশের লোকজন এদেশে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অধিকাংশ সময়ই তাদের নিজ দেশের কর্মীদের এদেশে নিয়ে আসছে। তাঁদের পেছনে বড় ধরনের অর্থ খরচ করছে। তাঁরা আসার কারণে এদেশের কর্মীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ মন্থর হয়ে পড়ছে। শুধু এক্সপার্ট হিসেবে সীমিত সময়ের জন্য লোক আনার নিয়ম থাকলেও বিভিন্ন পদেই এদেশে অনেকে কাজ করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি করছেন। বছরের পর বছর চাকরি করছেন।


প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়ন আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য আরেকটি হুমকি বা চ্যালেঞ্জ। কারণ উন্নত দেশগুলো যত তাড়াতাড়ি প্রযুক্তির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে আমরা তা পারি না। কেননা প্রযুক্তি কখনো কখনো বেশ ব্যয়বহুল। এছাড়া উন্নত প্রযুক্তিকে ধারণ করার জন্য যে ধরনের মেধা প্রয়োজন, যোগ্যতা প্রয়োজন সেখানেও আমাদের ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। এ কারণে আমাদের মানবসম্পদকে বারবার বন্ধুর পথ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।


ব্যবসার সম্ভাবনা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। আজকে যে সম্ভাবনা নিয়ে একজন উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করছেন বিভিন্ন কারণে তা যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। হতে পারে তা মূলধন সংকটের কারণে, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করার কারণে কিংবা অন্য যে কোনো কারণে। এটিও মানবসম্পদের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। পরিবর্তিত এই অবস্থার সাথে যদি মানবসম্পদ তাল মেলাতে না পারে তাহলে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে হয়।


আমাদের দেশে মেধাবীদের এক সময় আগ্রহ ছিল সরকারি চাকরির প্রতি। পড়ালেখা শেষ করেই চেষ্টা করত সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য। বিশেষকরে বিসিএস এর প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। কিন্তু এখন ওই আগ্রহে ভাটা পড়েছে। এখন মেধাবীদের আগ্রহ বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক ও কর্পোরেট হাউজগুলোর প্রতি। সেখানে প্রদত্ত সুযোগ সুবিধাগুলো তাঁদের আকৃষ্ট করছে। কয়েক বছর চাকরি করলেই ছয় ডিজিটের বেতন পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এ ধারা চলতে থাকলে এক সময় দেখা যাবে কম মেধাবীরাই তুলনামূলকভাবে বেশি মেধাবীদের নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ যে কোনো নিয়মকানুন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেই তৈরি হয়। সচিবালয় থেকে সকল নিয়মকানুন তৈরি হয়। সেখানে যদি মেধাবীদের সমাগম না ঘটে তাহলে তা কম মেধাবীদের দখলেই চলে যাবে। তাই এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া জরুরি। পরিবর্তনের জন্য সরকারি চাকরি বিশেষকরে বিসিএস দিয়ে যাঁরা চাকরি পাচ্ছেন তাঁদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন যেন মেধাবীরা আগ্রহী হয়।

(চলবে)


মঞ্জুরুল আলম

সাবেক হেড, এইচআর ডিভিশন

ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer