Global Header Bottom
আমেরিকায় কনফারেন্সে যোগদান এবং আমার অভিজ্ঞতা

আমেরিকায় কনফারেন্সে যোগদান এবং আমার অভিজ্ঞতা

আমেরিকায় কনফারেন্সে যোগদান   এবং আমার অভিজ্ঞতা

সম্প্রতি আমি আমেরিকায় গিয়েছিলাম একটি কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য। আমেরিকার সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (এসএইচআরএম) এর প্রেসিডেন্ট এবং সিইও জনি সি. টেইলর এর বিশেষ আমন্ত্রণে অতিথি হিসেবে ওই কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমেরিকার আলেকজান্দ্রিয়ায় সংগঠনটির হেড অফিস অবস্থিত। এই সংগঠন থেকেই এইচআর প্রফেশনালদের কোয়ালিফিকেশন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। উত্তর আমেরিকা এবং বিশে^র অন্যান্য দেশ বিশেষকরে ইউরোপের দেশগুলোতে কাজ করতে গেলে এই সার্টিফিকেটকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এই সার্টিফিকেটকে এইচআর প্রফেশনে বিশেষ যোগ্যতা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। পুরো পৃথিবীতে এ ধরনের দুই তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ইংল্যান্ডে রয়েছে সিআইপিডি, অর্থাৎ চার্টার্ড ইন্সটিটিউট অব পিপল ম্যানেজমেন্ট।

সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা এসএইচআরএম প্রতি বছর আমেরিকায় এই কনফারেন্সের আয়োজন করে। এই সংগঠনের কনফারেন্সই বিশে^র সর্ববৃহৎ এইচআর কনফারেন্স। এবারের আয়োজনে ১৯ হাজার এইচআর প্রফেশনালস স্ব-শরীরে কনফারেন্সে যোগদান করেছেন। এছাড়া প্রায় ২০ হাজার অংশগ্রহণকারী ভার্চুয়্যালি কনফারেন্সে যোগ দিয়েছেন। কোনো কোনো বছর এই সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সবকিছু বিবেচনা করলে এর চেয়ে বড় আর কোনো এইচআর কনফারেন্স পৃথিবীর অন্য কোথাও হয় না।

আমি আমার প্রতিষ্ঠানের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ এ ধরনের একটি কনফারেন্সে যোগদানের সুযোগ দেওয়ার জন্য। কারণ, অপ্রিয় হলেও সত্য আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করে না। বরং ছুটি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করে। এ সকল দিক বিবেচনা করলে আমি মনে করি আমার প্রতিষ্ঠান একজন কর্মীর এ ধরনের ইচ্ছাগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে। এটা ছিল আমার জন্য একটি বিশেষ সুযোগ। কারণ এই কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার কারণে আমি বুঝতে পেরেছি আগামী পাঁচ, দশ বছরে ওয়ার্ল্ড এইচআর প্র্যাকটিস কোন দিকে যাবে। মনে রাখতে হবে বিশে^র সাথে তাল মেলানো ছাড়া আমাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই। একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে মানবসম্পদের কল্যাণে। আগামী দিনের প্রতিযোগিতার ধরন কেমন হতে পারে আর ওই প্রতিযোগিতা মোকাবেলার জন্য কেমন মানবসম্পদ প্রয়োজন হবে তারই দিকনির্দেশনা কনফারেন্স থেকে আমরা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন কনফারেন্সে যে সকল তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে তার সবই অনেক গবেষণার ফল। এখানে মনগড়া বা অনুমাননির্ভর কোনো তথ্য-উপাত্ত বা বক্তব্য প্রদান করা হয়নি। আমরা এটাও উপলব্ধি করতে পেরেছি তাদের গবেষণার মান কতটা উচ্চমানের। ফলে এই কনফারেন্সে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই অনেক কিছু জানার এবং শেখার সুযোগ পেয়েছেন। কনফারেন্সে আমি সহ মোট পাঁচ জন অংশগ্রহণ করেছি। আমি আমন্ত্রিত অতিথি হওয়ার কারণে আমাকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়নি। কিন্তু অন্যদের এটা করতে হয়েছে। আমাদের দেশ থেকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এটা বেশ ব্যয়বহুল।

অর্ধ-দিবস, পূর্ণ-দিবস মিলিয়ে মোট পাঁচ দিনের কনফারেন্স ছিল এটি। তিন, চারটি কী-নোট প্রেজেন্টেশন ছিল। পাশাপাশি শত শত সেসন ছিল। একই সময়ে বিশ, পঁচিশটি সেসন চলেছে। যাঁর যে সেসন প্রয়োজন ছিল তিনি সেখানে অংশগ্রহণ করেছেন। আমেরিকার সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট এর সদস্যরা সেসনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্রেডিট পায়। এই ক্রেডিট সদস্যপদ নবায়নের সময় কাজে লাগাতে পারেন।

আমরা লিডারশিপ সেসনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ওই সেসনে বলা হচ্ছিল এইচআর প্রফেশনালদের লিডারশিপ রুল পালন করতে হবে। যদিও বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে এইচআর প্রফেশনালদের লিডারশিপ রুল পালন করতে দেখা যায় না। এটা পালন করা এই জন্য জরুরী যে এইচআর প্রফেশনালরা যদি সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় না থাকেন তাহলে অনেক সিদ্ধান্ত সঠিক নাও হতে পারে। কারণ তাঁরাই ভালো জানেন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোন পজিশনে কোন ধরনের কর্মী প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে যখন তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে তখন তাঁরা কোন কাজে, কোন সময়ে, কোন ধরনের কর্মী নিয়োগ দিতে হবে সেটা নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন। ওই সেসনে আরেকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একজন লিডার কতটা সফল তা নির্ভর করে তাঁর মেন্টরিংয়ে আরও কতজন নতুন লিডার তৈরি হয়েছে তার ওপর। লিডারের অনুসারী কতজন এটা বিবেচ্য বিষয় নয়। তিনি বিভিন্ন স্তরে কতজন লিডার তৈরি করতে পেরেছেন সেটার ওপর তাঁর সফলতা নির্ভর করবে। ওখানে বলা হচ্ছে এইচআর এর কাজ হলো মেধাবীদের হায়ার করা। অতপর তাঁদেরকে ট্রেনিং দিতে হবে, মেন্টরিং করতে হবে, গ্রুমিং করতে হবে, সাপোর্ট দিতে হবে, এবং অতপর তাঁদেরকে লিডার হিসেবে তৈরি করে ছেড়ে দিতে হবে যেন প্রত্যেকে নিজ থেকেই লিডারশিপ রুল পালন করতে পারেন। জনি সি. টেইলর তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, কেউ কারও জন্য কোনো কিছু তৈরি করে দেবে না। কেউ জায়গা ছেড়ে দেবে না। নিজের ক্ষেত্র নিজেকে তৈরি করতে হবে। তিনি বলেছেন কোনো প্রতিষ্ঠানে এইচআর প্রফেশনালরা যদি সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় না থাকতে পারেন তাহলে সেটা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং ওটা লিডারের ব্যর্থতা। আমাদের দেশে এইচআর এর অনেক কাজ এখন আউটসোর্সিং করা হচ্ছে। এমনকি নিয়োগ প্রক্রিয়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে এইচআর এর গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে।

একই সেসনে আরেকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমরা মনে করছি এআই আমাদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু জনি সি, টেইলর বলেন এআই আমাদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে না। এআই শুধু ওই কাজগুলোই করতে সক্ষম যে কাজগুলো রুটিনওয়ার্ক এবং বারবার করতে হয়। এআই এর নিজের কোনো উদ্ভাবন নেই। এআই এর নিজের কোনো সৃজনশীলতা নেই। আমার প্রতিষ্ঠানে কোন কাজ থেকে আমার কী প্রত্যাশা এটা আমি জানি, এটা এআই জানে না। মনে করুন কোনো পণ্যের একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করতে হবে। পণ্যের জন্য কেমন বক্তব্য প্রয়োজন, বক্তব্যের ভয়েজ কেমন টোনে হবে, লোকেশন কী হবে, মডেল কে হবে, বিজ্ঞাপনের ব্যাপ্তি কতক্ষণ হবে, ইত্যাদি বিষয়গুলো এআই ঠিক করে দেবে না। বাজার ও প্রতিযোগিতা বিশ্লেষণ করে এগুলো মার্কেটারকেই ঠিক করতে হবে। বিজ্ঞাপনে কোনো স্পেশাল ইফেক্ট এআই দিয়ে করতে হলে এআই’কে কিভাবে বলতে হবে এবং কোথায় কী লিখতে হবে এগুলো মার্কেটারকে জানতে হবে। ফলে মৌলিক কাজে যেমন মানুষ লাগবে, আবার ওই কাজ সম্পন্ন করার জন্য এআই’কে গাইডলাইন দেওয়ার জন্যও মানুষ লাগবে। মানুষকে বাদ দিয়ে এআই দিয়ে সব কাজ করানো যাবে এটা ঠিক নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে এআই দিয়ে আমরা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কাজ করাতে পারব, সব কাজ নয়।

কনফারেন্সে আরও একটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মী নিজেকে ডেভেলপ করলে প্রতিষ্ঠান সামনের দিকে এগোতে পারবে না। প্রত্যেক কর্মীর মধ্যে ডেভেলপমেন্ট আসতে হবে। এই ডেভেলপমেন্ট আনার জন্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লার্নিং কালচার ডেভেলপ করতে হবে। তাহলে প্রতিষ্ঠানের সকলেই শেখার সুযোগ পাবে। প্রত্যেকের মধ্যেই ডেভেলপমেন্ট দৃষ্টিগোচর হবে। আর এর ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠান সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

লেখার বিষয়বস্তু একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত।

এইচআর অ্যাডভাইজার, আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ হিউম্যান রিসোর্স অর্গানাইজেশনস প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক ফেডারেশন অব হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট এইচআর অ্যাডভাইজার, আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ হিউম্যান রিসোর্স অর্গানাইজেশনস প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক ফেডারেশন অব হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer