Global Header Bottom
পরিচিতি নাকি প্রকৃত যোগ্যতা?

রেফারেল রিক্রুটমেন্ট

পরিচিতি নাকি প্রকৃত যোগ্যতা?

পরিচিতি নাকি প্রকৃত যোগ্যতা?

“দ্য রাইট রেফারেল ইজ নট জাস্ট অ্যা নৌন পারসন- ইট ইজ দ্য রাইট পারসন ফর দ্য রাইট রুল অ্যাট দ্য রাইট টাইম” বাংলাদেশের কর্পোরেট জগতে রেফারেল রিক্রুটমেন্ট বর্তমানে একটি জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত নিয়োগ কৌশল। প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি, কীভাবে এই পদ্ধতি “রাইট পিপল ইন রাইট প্লেস অ্যাট রাইট টাইম” নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রতিটি ইতিবাচক ব্যবস্থার মতো রেফারেল রিক্রুটমেন্টেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, কর্মীরা পরিচিত বা কাছের কাউকে সুপারিশ করলেও সবসময় চাকরির ধরন, কাজের প্রকৃতি কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত প্রয়োজনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে প্রার্থীকে রেফার করা হয়। কিন্তু একজন পরিচিত ব্যক্তি মানেই তিনি সেই নির্দিষ্ট কাজের জন্য উপযুক্ত এমনটি সবসময় সত্য নয়। আধুনিক এইচআর প্র্যাকটিস এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই “রেফারেল কি শুধু পরিচিত কাউকে সুযোগ দেওয়া, নাকি প্রতিষ্ঠানের জন্য সঠিক মানুষ খুঁজে বের করা?” এই প্রশ্নের উত্তরই রেফারেল রিক্রুটমেন্টের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে।

রেফারেল মানেই কি সঠিক প্রার্থী?

বাংলাদেশের চাকরির বাজারে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে তাঁর বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিত বা সাবেক সহকর্মীরা সেই প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার জন্য তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। অন্যদিকে কর্মীরাও অনেক সময় সম্পর্কের জায়গা থেকে কাউকে রেফার করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো রেফার করা ব্যক্তি কি সত্যিই সেই পদের জন্য উপযুক্ত? অনেক সময় দেখা যায়,

  • প্রার্থীর দক্ষতা চাকরির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

  • প্রার্থী প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না।

  • কাজের চাপ বা দায়িত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারণা থাকে না।

  • প্রতিষ্ঠানের বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় তিনি অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন।

  • ভুল সময়ে ভুল নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

অর্থাৎ, শুধুমাত্র পরিচিত হলেই কেউ “রাইট ক্যানডিডেট” হয়ে যায় না। রেফারেল রিক্রুটমেন্টের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যোগ্য ও উপযুক্ত মানুষকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু যদি রেফারেল শুধুমাত্র সম্পর্কনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

“রাইট প্লেস” না বুঝে রেফার করার ঝুঁকি

বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোথাও প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষমকর্মী, কোথাও বিশ্লেষণধর্মী ও ধৈর্যশীল মানুষ, আবার কোথাও প্রয়োজন উচ্চমানের ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা। কিন্তু রেফারকারী অনেক সময় শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পরিচিতির ভিত্তিতে প্রার্থীকে সুপারিশ করেন। তিনি হয়তো বিবেচনাই করেন না,

  • এই কাজের প্রকৃতি কী?

  • প্রার্থী কি এই ধরনের দায়িত্ব পালনে মানসিকভাবে প্রস্তুত?

  • তাঁর দক্ষতা কি বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

  • প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি কি তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই?

  • প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই এই মুহূর্তে এই ধরনের জনবল প্রয়োজন বলে মনে করছে?

এই প্রশ্নগুলো বিবেচনা না করলে অনেক সময় ভুল ব্যক্তি ভুল জায়গায় নিয়োগ পান। এর প্রভাব শুধু প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে না; প্রার্থী নিজেও হতাশ হয়ে পড়েন। কারণ তিনি হয়তো এমন একটি কাজের মধ্যে প্রবেশ করেন যা তাঁর দক্ষতা, আগ্রহ বা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় কর্মদক্ষতা হ্রাস, মানসিক চাপ এবং দ্রুত চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা।

“রাইট টাইম” বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ

রেফারেল রিক্রুটমেন্ট এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “রাইট টাইম”। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িক চাপের কারণে দ্রুত নিয়োগ দেয়। আবার অনেক কর্মীও তাঁদের পরিচিত কাউকে চাকরিতে ঢোকানোর জন্য তাড়াহুড়া করেন। কিন্তু এইচআর এর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি নিয়োগের একটি স্পষ্ট বিজনেস নীড থাকতে হয়। ভুল সময়ে নিয়োগ দিলে কী হতে পারে?

  • কর্মীর কাজের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা।

  • টিমে দায়িত্বের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।

  • অপ্রয়োজনীয় জনবল ব্যয় তৈরি হওয়া।

  • কর্মীর কর্মদক্ষতা কমে যাওয়া।

  • ভবিষ্যতে অসন্তোষ বা চাকরি ছাড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া।

তাই শুধুমাত্র ভ্যাকেন্সি আছে বলেই নিয়োগ দেওয়া এইচআর-এর দায়িত্ব নয়। বরং প্রতিষ্ঠান সত্যিই সেই মুহূর্তে কী ধরনের দক্ষতা চায়, সেটি বিশ্লেষণ করাই এইচআর-এর মূল কাজ।

এইচআর বিভাগের প্রকৃত ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

রেফারেল রিক্রুটমেন্ট সফল করতে এইচআর বিভাগকে সবচেয়ে দায়িত্বশীল এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হয়। কারণ এইচআর-ই হলো সেই বিভাগ, যারা পরিচিতি ও যোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে। এটা করতে হলে যা করা প্রয়োজন,

প্রথমত, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।

রেফারেল প্রার্থী হলেও তাঁকে অবশ্যই একই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যেমন সিভি স্ক্রিনিং, স্কিল অ্যাসেসমেন্ট, বিহেভিয়্যরাল ইন্টারভিউ, টেকনিক্যাল ইভালুয়্যশন, এবং কালচারাল ফিট অ্যাসেসমেন্ট ইন্টারভিউ। এগুলোর সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করতে হবে। এইচআর-এর দায়িত্ব হলো পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া “রেফারেল গিভস অপোরচুয়্যনিটি ফর কনসিডারেশন, নট গ্যারান্টেড সিলেকশন”। অর্থাৎ রেফারেল কাউকে সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু চাকরি নিশ্চিত করে না।

দ্বিতীয়ত, জব রুল এবং অর্গানাইজেশনাল নীড পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করা।

অনেক সময় কর্মীরা নিজেরাও পদের প্রকৃতি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন না। তাই এইচআর বিভাগকে স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত জব ডেসক্রিপশন তৈরি করতে হবে। এতে থাকতে হবে কাজের প্রকৃতি, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা, দায়িত্বের চাপ, কর্মপরিবেশ, পারফরমেন্স এক্সপেকটেশন। ক্যারিয়ার গ্রোথ অপোরচুয়্যনিটিতে যত বেশি স্বচ্ছতা থাকবে, তত বেশি সঠিক প্রার্থী পাওয়া সম্ভব হবে।

তৃতীয়ত, কালচারাল ফিট মূল্যায়ন করা।

বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, দক্ষ কর্মী হয়তো কাজ পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না। কেউ হয়তো অত্যন্ত স্বাধীনভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি টিমভিত্তিক কাজকে গুরুত্ব দেয়। আবার কোথাও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি, কোথাও ধীর ও কাঠামোবদ্ধ পরিবেশ। তাই এইচআর-এর দায়িত্ব শুধু দক্ষতা যাচাই নয়; বরং দেখতে হবে প্রার্থী প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন কিনা। কারণ একজন কর্মীর দীর্ঘমেয়াদি সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে তাঁর কালচারাল কমপ্যাটিবিলিটির ওপর।

চতুর্থত, রেফারেল পলিসি তৈরি করা।

বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও রেফারেল রিক্রুটমেন্ট-এর জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। ফলে অনেক সময় বিভ্রান্তি, পক্ষপাতিত্ব বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তৈরি হয়। একটি কার্যকর রেফারেল পলিসিতে থাকতে পারে- কে কাকে রেফার করতে পারবেন, কোন পদে রেফারেল গ্রহণযোগ্য, সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট এর নীতিমালা, রেফারেল বোনাস এর নিয়ম, এবং এইচআর-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রফেশনালিজম আরও শক্তিশালী হয়।

প্রার্থীদের কী প্রত্যাশা থাকা উচিত?

রেফারেল রিক্রুটমেন্ট নিয়ে অনেক প্রার্থীর একটি ভুল ধারণা থাকে “পরিচিত কেউ রেফার করেছে মানেই চাকরি নিশ্চিত” এই মানসিকতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রার্থীদের বুঝতে হবে রেফারেল একটি সুযোগ, নিশ্চয়তা নয়। দক্ষতা ও যোগ্যতাই চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়। ইন্টারভিউ এবং অ্যাসেসমেন্ট-এ নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ও কাজের বাস্তবতা বুঝতে হবে। শুধুমাত্র সম্পর্ক নয়, প্রফেশনাল প্রিপারেশন-ই সফলতার মূল চাবিকাঠি। অনেক সময় প্রার্থীরা ধরে নেন, পরিচিত কেউ প্রতিষ্ঠানে থাকায় তাঁদের প্রতি আলাদা সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু আধুনিক এইচআর প্র্যাকটিস-এ এই ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং একজন পেশাদার প্রার্থীর উচিত,

  • জব রুল ভালোভাবে বোঝা।

  • নিজের দক্ষতা মূল্যায়ন করা।

  • প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা।

  • বাস্তবসম্মত ক্যারিয়ার এক্সপেকটেশন রাখা।

  • নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত থাকা।

সম্পর্ক নয়, যোগ্যতাই হোক মূল ভিত্তি

বাংলাদেশের কর্পোরেট সংস্কৃতি যত বিকশিত হচ্ছে, রেফারেল রিক্রুটমেন্ট ততই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। তবে এই ব্যবস্থার প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে একটি মৌলিক সত্যের ওপর “রিলেশনশিপ শুড সাপোর্ট রিক্রুটমেন্ট, নট রিপ্লেস মেরিট”। অর্থাৎ, পরিচিতি সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজায় প্রবেশ করার যোগ্যতা তৈরি করতে হয় দক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং কর্মক্ষমতার মাধ্যমে। একজন পরিচিত মানুষকে প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসা সহজ; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের জন্য সঠিক মানুষকে খুঁজে বের করা সেটিই এইচআর-এর প্রকৃত সাফল্য। কারণ ভুল মানুষকে ভুল সময়ে ভুল জায়গায় নিয়োগ দেওয়া শুধু একটি নিয়োগের ব্যর্থতা নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি, কর্মদক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আধুনিক কর্পোরেট বিশ্বে সফল প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো শুধুমাত্র সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকে মেধা, যোগ্যতা, ন্যায়সংগত মূল্যায়ন এবং সঠিক নিয়োগ সিদ্ধান্তের ওপর। তাই রেফারেল রিক্রুটমেন্ট-এর প্রকৃত শক্তি তখনই তৈরি হবে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচিতির চেয়ে যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেবে, আর এইচআর বিভাগ নিশ্চিত করবে “দ্য রাইট পারসন ইজ হায়ার্ড ফর দ্য রাইট রুল, অ্যাট দ্য রাইট প্লেস, অ্যান্ড অ্যাট দ্য রাইট টাইম”। কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তারা কাকে চেনে তার ওপর নয়, বরং তারা কাকে সঠিকভাবে নির্বাচন করতে পারে তার ওপর।

অনুভব রহমান হলেন একজন সুপরিচিত বাংলাদেশি মানবসম্পদ (HR) পেশাদার, যিনি বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নগদ লিমিটেড-এর চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের করপোরেট ও ফিনটেক খাতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি এবং নেতৃত্বের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer