Global Header Bottom
বিক্রয় বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত কিছু কৌশল

বিক্রয় বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত কিছু কৌশল

বিক্রয় বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত কিছু কৌশল



আমরা যাঁরা সেলস এবং মার্কেটিং নিয়ে কাজ করি তাঁদের সবসময় ভাবনা থাকে বিক্রয় বৃদ্ধি নিয়ে। যদিও আমরা বিক্রয় বৃদ্ধির কথা বলি, বাস্তবিক অর্থে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় চিন্তা করে রেভিনিউ বা আয় বৃদ্ধি নিয়ে। দিনশেষে একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা নির্ভর করে ধারাবাহিক বিক্রয় বৃদ্ধির ওপর। বিক্রয় বৃদ্ধি তথা রেভিনিউ বৃদ্ধিই একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার মৌলিক ধারণা বা ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্ট। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয় তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ওই প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে আয় বৃদ্ধির পথ তৈরি করতে হবে। আয় বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিয়ত বিক্রয় বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হয়। এ কারণে ব্যবসা জগতে একটি সাধারণ প্রশ্ন করা হয় আপনার ব্যবসার মডেল কী বা বিজনেস মডেল কী। আসলে এই প্রশ্ন দ্বারা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় প্রতিষ্ঠানের রেভিনিউ আসার উপায়গুলো কী; আরও সাবলীল ভাষায় বললে রেভিনিউ’র মডেল কী। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান কীভাবে টাকা উপার্জন করবে। এখান থেকে দিনশেষে আমরা বুঝে নিতে পারি রেভিনিউ মডেল মানে হচ্ছে বিক্রয় বৃদ্ধির কৌশল কী। আমরা জানি পণ্যভিত্তিক ব্যবসায় (সেবা-সংক্রান্ত নয়) আয় একটি জায়গা থেকেই আসতে পারে আর সেটি হচ্ছে পণ্য বিক্রি। বিক্রয় বৃদ্ধির হাজারো কৌশল আছে বা থাকতে পারে যেমন, বেশি দোকানে বিক্রি করা, কম সংখ্যক দোকান বা বড় দোকানে বেশি বিক্রি (বাজারে সেরা ২০ শতাংশ বা ২৫ শতাংশ দোকানে ৭০ শতাংশ-৮০ শতাংশ পণ্য বিক্রি করা), নতুন পণ্য উন্নয়ন, নতুন বাজার সৃষ্টি বা একই পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার খুঁজে বের করা এবং এর প্রচারণার ব্যবস্থা ইত্যাদি।

একটি কোম্পানি যখন নিয়মিত পণ্য বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে তখন একটি পর্যায়ে ওই কোম্পানির পণ্য বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটি এমন নয় যে একদিনে বা রাতারাতি পণ্য বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যাবে। বিক্রয় বৃদ্ধির কাজটি আসলে ধীরে ধীরে করতে হয়। প্রতিদিন অল্প অল্প করে পণ্য বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হয়। অল্প পরিমাণ বিক্রি বৃদ্ধি পেলেই কয়েকদিনে সেটা বড় আকার ধারণ করে। সপ্তাহ শেষে ওই পরিমাণ আরেকটু বড় হয়। মাস শেষে আরও বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিনের অল্প বিক্রয় বৃদ্ধির ব্যাপারটি বা পরিকল্পনাটি যখন আমরা সপ্তাহ শেষে দেখি তখন দেখা যাবে বিক্রির পরিমাণ ভালোই বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন এক মাস শেষে দেখবো তখন দেখা যাবে বিক্রির পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। তিন মাস পর, ছয় মাস পর যখন আমরা হিসাব করব তখন দেখা যাবে ওই পরিমাণটা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে প্রতিদিনের অল্প বিক্রয় বৃদ্ধির ব্যাপারটি বা পরিকল্পনাটি যখন এক বছর শেষে বিক্রির পরিমাণ হিসাব করব তখন দেখা যাবে অল্প পরিমাণ বৃদ্ধির চেষ্টাই এক সময় অনেক বড় পরিমাণে পরিণত হয়েছে। এটিকে আমরা এক বছরের সাথে আরেক বছরের তুলনা করেও দেখতে পারি। তখন আমরা দেখতে পাবো বিক্রির পরিমাণ অন্যান্য বছর থেকে কিভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য প্রতিদিন টার্গেট করতে হয়। এটি এমন নয় যে বছরে একবার টার্গেট করে হঠাৎ করেই বিক্রি বাড়িয়ে ফেলা সম্ভব। বিক্রয় বৃদ্ধি করতে হলে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়, প্রতিদিন টার্গেট করে অল্প অল্প পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হয়। এভাবেই একসময় বিক্রির পরিমাণকে অনেক বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এটাই বিক্রয় বৃদ্ধির ফান্ডামেন্টাল নেচার বা মৌলিক প্রকৃতি।

প্রশ্ন হতে পারে গ্রোথ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে হলে গ্রোথ প্রয়োজন। পণ্যবাজার সবসময় প্রতিযোগিতায় পূর্ণ। তাই এখানে টিকে থাকতে হলে গ্রোথের কোনো বিকল্প নেই। যদি কেউ এটা না করে তাহলে তাঁর প্রতিষ্ঠান একসময় বাজার থেকে হারিয়ে যাবে। একজন বিখ্যাত নৃ-বিজ্ঞানী একটি উক্তি করেছিলেন “আজকে তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছো ঠিক ওই একই জায়গায় আগামী দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হলে আজকের থেকে আরও অধিক পরিমাণে চেষ্টা করতে হবে”- কারণ আমি যদি গতকালের মতো আজকে কাজ করি এবং আজকের মতো আগামী দিন কাজ করি তাহলে আমার গতি একই থাকবে কিন্তু আমার পেছনে যে আছে তিনি হয়তো আরও গতিশীল হয়ে আমাকে পেছনে ফেলে সামনে চলে যাবে। ফলে আমি আমার অবস্থানে থাকতে পারবো না। বিষয়টি অনেকটা এরকম, আমি কোনো দৌঁড় প্রতিযোগিতায় সপ্তম স্থানে থেকে দৌঁড়াচ্ছি। দেখা গেল যে ব্যক্তি নবম বা দশম স্থানে আছে সে আরও জোরে দৌঁড়াচ্ছে। ফলে আমাকে যখন ছাড়িয়ে যাবে তখন আমার অবস্থান আর সপ্তম থাকবে না। আমি তখন অষ্টম বা আরও পেছনে চলে যাবো। এ কারণে নিজের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে হলেও আগের চেয়ে অধিক পরিমাণে কাজ করতে হবে। অধিক পরিশ্রম করতে হবে। অধিক পারফরমেন্স দেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর কোম্পানির পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এই ব্যয় বৃদ্ধির নানাবিধ কারণ রয়েছে। প্রতিবছর কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পায়। প্রতিবছর কর্মচারীদের বোনাস দিতে হয়। বোনাসের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পায়। নানাবিধ কারণে প্রতিষ্ঠানকে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়াতে হয়। এই ব্যয়ের সাথে প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ানো প্রয়োজন। বলা যেতে পারে এটি অপরিহার্য। আরও কারণ রয়েছে। যেমন - একজন কর্মীর জীবনযাপন ব্যয় প্রতিবছর বৃদ্ধি পায়। এর সাথে যদি তাঁর আয় বৃদ্ধি না পায় তাহলে ওই কর্মীকে প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখা সম্ভব নয়। কারণ তখন কর্মীর মধ্যে প্রেষণা কাজ করে না। কর্মী কর্মোদ্দীপনা হারিয়ে ফেলেন। কর্মীর মধ্যে বিষণœতা চলে আসে। দিনশেষে কর্মীর উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। উৎপাদনশীলতা কমে গেলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে বেড়ে যায় পণ্যের বিক্রয় মূল্য। এই অবস্থায় প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে পারে না। প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মনোবল ঠিক রাখার জন্য, কর্মোদ্দীপনা ধরে রাখার জন্য, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বাড়ানোর জন্য তাঁদের বেতন, বোনাস এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের আয় না বাড়লে কর্মীদের পেছনে এই ব্যয়গুলো করা সম্ভব নয়। আর আয় বৃদ্ধির জন্যই প্রয়োজন বিক্রয় বৃদ্ধি করা। তবে এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে বা পাচ্ছে তার চেয়ে অধিক পরিমাণে কর্মীর আয় বাড়াতে হবে। যদি সেটা না হয় তাহলে দিনশেষে কর্মীর অবস্থা আগের চেয়ে খারাপের দিকে চলে যাবে। তখন কর্মীর জীবনমান খারাপ হবে। তাঁর মধ্যে বিষণœতা কাজ করবে। তাই কর্মীকে প্রেষণা দেওয়ার জন্য, কাজের প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলার জন্য, কাজের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য অবশ্যই ব্যয় অপেক্ষা আয়ের পরিমাণটা বাড়িয়ে দিতে হবে। তবে হ্যাঁ আমরা একটি জায়গায় এখনও ভুল করি। আমরা মনে করি একজন কর্মী নিয়োগ দিলে সে ভালোভাবে কাজ করবে। বিষয়টি তেমন নয়। একজন বিক্রয়কর্মীর জন্য ট্রেনিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো আমাদের দেশে ট্রেনিংয়ের পেছনে কো¤পানিগুলো বিনিয়োগ করতে চায় না। একজন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে তাঁর নিকট থেকে আমরা ভালো আউটপুট আশা করতে পারি। কিন্তু তাঁকে গড়ে না তুলে একই ধরনের কাজ আশা করা ঠিক নয়, এটি সম্ভবও নয়। তাই সেলস এর পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হলে সেলস টিমের পেছনে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রশিক্ষণের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।

এফএমসিজি, এনজিও, ব্যাংক, এনবিএফআই এবং এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সেলস ডিভিশনে যাঁরা কাজ করে তাঁদের সবসময় বিক্রি বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীরা ফ্রন্টলাইনের সোলজার নামে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানের সেলস টিমকে বলা হয় প্রতিষ্ঠানের লাইফলাইন। একথা যেমন ঠিক, তেমনি ঠিক এই সেক্টরে কাজ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সেলসের প্রথমেই নিজেকে ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে হয়, নিজের আচার-আচরণ, বাচনভঙ্গি, কথাবার্তা সব কিছুই ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে হয়, তারপর পণ্যের মাধ্যমে পেশাদারী বিক্রয় কার্যক্রম গড়ে তুলতে হয়। বিক্রয়কর্মীকে অবশ্যই সবসময় বিক্রয় টার্গেট অর্জনের চেষ্টা করার মানসিকতা থাকতে হয়। সেলস টিমের একজন সদস্যকে প্রতিনিয়ত তাঁর নিজের রেকর্ড ভেঙ্গে কাজ করতে হয়। তাঁকে প্রতিনিয়ত নিজের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। প্রতিনিয়ত নিজের গড়া রেকর্ড ভাঙতে হয়। গতকাল থেকে আজকে আরেকটু বেশি কাজ করতে হয়। গতকাল যদি আট ঘণ্টা কাজ করে, আজকে তাঁকে সেলস বাড়ানোর জন্য আগের চেয়ে একটু বেশি কাজ করতেই হবে। হতে পারে সেটা এক ঘন্টা বা আধা ঘন্টা বেশি। গতকাল যতগুলি দোকান ভিজিট করেছে আজকে অন্তত দুটি দোকান বেশি ভিজিট করতে হবে, অন্যথায় দেখা যাবে বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে না। সেলসম্যান যদি দোকান বৃদ্ধি করতে না পারে তাহলে অবশ্যই বর্তমানে যতগুলি দোকানে পণ্য সরবরাহ করছে সেখান থেকে বাছাই করে এমন কয়েকটি দোকান খুঁজে বের করতে হবে যেখানে অন্তত দুটি করে বেশি পণ্য বিক্রি করা যাবে। অর্থাৎ আমি যদি কোনো দোকানে ২০০ গ্রামের পাঁচটি দুধের প্যাকেট বিক্রি করি তাহলে আমাকে অবশ্যই সব মিলিয়ে ওই দোকানে এক হাজার গ্রাম অপেক্ষা বেশি বিক্রির চেষ্টা করতে হবে। এই বেশি বিক্রি করতে গিয়ে এমনও হতে পারে ৬টি ২০০ গ্রামের প্যাকেট বিক্রি করতে হবে অথবা ২০০ গ্রামের পাশাপাশি ৫০০ গ্রামের একটি বিক্রি করতে হবে কিংবা ৩০০ গ্রামের পাঁচটি বিক্রি করতে হবে বা ২০০ গ্রামের তিনটি, ৪০০ গ্রামের একটি, ৫০০ গ্রামের একটি বিক্রি করতে হবে। অর্থাৎ গতকাল যা বিক্রি করেছি তার চেয়ে বেশি বিক্রি করতে হবে। আর এই কাজগুলো করতে গিয়েই সবসময় কাজের একটি চাপ অনুভব করতে হয় আমাদের বা যাঁরা সেলস-মার্কেটিং-এ কাজ করেছি তাঁদের। এই চাপ অনেকে উপভোগ করে, আবার অনেকে করতে পারে না। যাঁরা উপভোগ করে তাঁদের সংখ্যা খুব বেশি একথা বলার অবকাশ নেই। বরং অনেকেই এটিকে একটি চাপ মনে করে। যে কারণে দেখা যায় আমাদের দেশের অনেক ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করার পরে এই পেশায় সহজে আসতে চায় না। তবে একথাও ঠিক এই পেশায় ভালো করতে পারলে তাঁর জীবনের উত্থান এবং সফলতা অন্য যে কোনো পেশা অপেক্ষা অনেক অনেক বেশি হয়।

আমাদের দেশে অনেক দোকান আছে যেখানে দেখা যায় একই পণ্য প্রতিবার একই সংখ্যায় রাখার চেষ্টা করে। যেমন একটি দোকান হয়তো কোনো কোম্পানির চিপস সব সময় একই পরিমাণে রাখে। হতে পারে সেটা পাঁচ ডজন। বিক্রয় বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে তখন চেষ্টা করতে হবে ওই দোকানে ছয় ডজন বা আরও বেশি কিংবা অন্তত সাড়ে পাঁচ ডজন চিপস বিক্রি করার। অনেক দোকানে প্রোডাক্টের সকল লাইন রাখতে চায় না। সেক্ষেত্রে দোকানে অন্য লাইনের প্রোডাক্ট দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। অনেক দোকানে একই কোম্পানির সকল ধরনের পণ্য রাখতে চায় না। আবার একই ধরনের সকল পণ্যও রাখে না। যেমন চিপস এর মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও সকল ধরনেরটা রাখে না। সেক্ষেত্রে চেষ্টা করতে হবে সকল ধরনের চিপস ওই দোকানে দেওয়ার জন্য। অর্থাৎ দোকানদারকে সংখ্যা বা ক্যাটাগরির মধ্যে আবদ্ধ রাখা যাবে না। সেলসম্যানকে একই দোকানে অন্যান্য পণ্য বা পরিমাণে অধিক পণ্য বিক্রির চেষ্টা করতে হবে। তাহলে দেখা যাবে তাঁর পণ্য বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। অনেক সময় আচরণগত দিক থেকেও দোকানদারকে প্রভাবিত করা যায়। দোকানদারের সাথে প্রতিদিনের সাক্ষাৎ কিভাবে হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে দোকানে বিক্রির পরিমাণ কেমন হতে পারে। এজন্য কিছু পরীক্ষিত বিক্রয় কৌশল আছে যেমনঃ

১। সেলস কল বা কার্যকরী সেলস কল বৃদ্ধি করা

২। অবজেকশন হ্যান্ডেলিং বা অভিযোগ সামলানোর মাধ্যমে বিক্রয় বৃদ্ধি

৩। আপ-সেলিং – আপ-সেলিং বিক্রি একটি বিক্রয় কৌশল যা বিক্রয়কর্মী তাঁর ক্রেতাদেরকে আরও বেশি দামি পণ্য ক্রয়ের জন্য উৎসাহিত করে।

৪। ক্রশ-সেলিং - বর্তমানে ক্রস-সেলিং বিক্রয় কৌশলও একটি জনপ্রিয় কৌশল। এখানে একজন ক্রেতা যে পণ্য ক্রয় করেছে তার সাথে সম্পর্কিত অন্য একটি পণ্য ক্রেতাকে ক্রয় করতে অনুপ্রাণিত করা। যেমন যে চায়ের দোকানদার টি-ব্যাগ প্রতিনিয়ত বিক্রি করে, তাঁর কাছে টি ব্যাগের সাথে একটি বিস্কুট বা এক প্যাকেট চিনি দেয়া যেতে পারে।

৫। পুশ সেলিং/পুল সেলিং

৬। রেঞ্জ সেলিং- বিক্রয় বৃদ্ধির অন্যতম কৌশল হলো সকল সেগমেন্ট হতে পণ্য বিক্রয় করা। এখানে যতবেশি সংখ্যক এসকেইউ বিক্রি করা যায় তত ভালো। যদি ক্যাশ মেমোতে ২০ টি পণ্য বা এসকেইউ থাকে তবে একটি সিঙ্গেল দোকানে ১ থেকে ২০ পর্যন্ত সমস্ত ২০ টি এসকেইউ বিক্রি করার লক্ষ্য নিতে হয় ।

৭। ফ্র্যাকশন সেলিং: এটি হচ্ছে, সবসময় যেসব দোকানে এক কার্টন বা এক কেজি পণ্য বিক্রি করা হয় সেখানে এক কার্টনের সাথে আরও ৪ টি বা ৬ টি বাড়তি পণ্য বিক্রি করা হয়।

একজন সেলসপারসন তাঁর ব্যবহার এবং আচরণ দিয়ে বিক্রয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি কিভাবে দোকানদারের সাথে কথা বলছেন তার ওপর নির্ভর করে তাঁর প্রতি ওই দোকানদার কেমন মনোভাব দেখাবে। সেলসপারসন দোকানদারের সাথে একটি হাসি দিয়ে বা সালাম দিয়ে অথবা অন্য কোনো আইকনিক সিম্বল দিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করতে পারে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমি দোকানদারের মনোযোগ প্রথমেই কিভাবে আকর্ষণ করতে চাই। আমার অ্যাপ্রোচ যদি দোকানদারের কাছে ইতিবাচক মনে হয়, আমার আচরণিক বিষয়টিকে সহজভাবে, ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে তাহলে খুব সহজেই আমি তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবো। এ কারণে সেলস এ যাঁরা কাজ করে তাঁদের সবসময় খেয়াল রাখতে হয় বডি ল্যাংগুয়েজ সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রতি। বডি ল্যাংগুয়েজ কোন ক্ষেত্রে কেমন হওয়া উচিত এই জায়গাটিতে যদি সেলস এর লোক কোনো ভুল করে তাহলে সেখান থেকে ভালো ফল পাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হবে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে “মর্নিং সৌজ দ্য ডে”- এ কারণে প্রথমেই একজন সেলসপারসনকে চিন্তা করতে হবে কিভাবে তিনি তাঁর ক্রেতার মনোযোগ ইতিবাচকভাবে আকর্ষণ করতে পারে।

বিক্রয়কর্মীকে সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন হতে হবে। তাঁকে সবসময় একটু অধিক পরিমাণে কাজ করার মনোভাব রাখতে হবে। গতকাল তিনি যে পরিমাণ কাজ করেছেন আজকে তার চেয়ে একটু বেশি কাজ করার ইচ্ছা তাঁর মনে আগে থেকেই ঠিক করা থাকলে অতিরিক্ত কাজ কখনো তাঁর নিকট কঠিন বা কষ্টকর মনে হবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের সেলস টিমে বা সেলস ডিভিশনে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের মধ্যে অনেকে কখনো কখনো বিক্রয়ের আমলাতান্ত্রিক কাজে জড়িয়ে মূল কাজ থেকে দূরে সরে যান বা মাঠ-পর্যায়ে নজর রাখতে পারেন না। বিক্রয়কর্মীকে সবসময় সিনিয়রদের নিকট থেকে পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এটি হতে পারে তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের সিনিয়রদের নিকট থেকে, পরামর্শের উৎস হতে পারে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমপর্যায় বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা মেন্টর। কাজ শেষে বাড়ি ফেরা এবং পরিবারকে সময় দিয়ে নিজের মন এবং শরীরকে প্রফুল্ল রাখতে হবে যেন পরের দিন কাজের একটি উদ্যম তিনি নিজের মধ্যেই খুঁজে পান। কখনো কখনো তিনি নিজেকে অন্যান্য কাজের সাথে স¤পৃক্ত রাখতে পারেন যা তাঁর মনের মধ্যে সজীবতা জাগিয়ে তুলতে পারে। অনবরত কাজ করা কিংবা অতিরিক্ত কাজের মধ্যে ডুবে থাকা কখনো কখনো বিষণœতার জন্ম দিতে পারে বা কাজকে চাপ মনে হতে পারে। এ কারণে তাঁকে দেখতে হবে কাজ ছাড়া আর কী করলে তাঁর মনের মধ্যে প্রফুল্লতা আসে এবং তাঁকে ওই ধরনের কাজের সাথে বা পরিবেশের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হবে যেন তাঁর কর্মস্পৃহা আরও বেড়ে যায়।

সেলসকে বলা হয় আর্টস এবং সাইন্স। কারণ সেলসপারসন বা বিক্রয়কর্মী একটি দোকানে যাওয়ার পর যেভাবে দোকানদারের সাথে তাঁর ভাব বিনিময় হয় সেটা একটি বিক্রয়কর্ম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি হতে পারে সালাম দিয়ে, হতে পারে হাসি দিয়ে বা হতে পারে অন্য কোনোভাবে। যেভাবেই তাঁর সাথে সাক্ষাৎপর্বটি শুরু হোক না কেন এটি একটি ভালো অর্ডার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দোকানদার ব্যস্ত থাকলে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। দোকানদার যখন ফ্রি হবে বা কাস্টমার চলে যাবে তখনই দোকানদারের সাথে কথা বলার সঠিক সময়। এ কারণে একজন বিক্রয়কর্মীকে সবসময় খেয়াল রাখতে হয় কোন সময় কি কথা বলা যাবে, কোন সময় কি কথা বলা যাবে না বা ঠিক হবে না। একজন সেলসপারসনের পণ্য সম্পর্কে জ্ঞান, তাঁর আচরণ, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, ভয়েজ টোন এবং আনুষঙ্গিক আরও কিছু বিষয় মিলেই ক্রেতার নিকট তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। এই গ্রহণযোগ্যতাই তাঁর পণ্য বিক্রির পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করে। আর এগুলোই হচ্ছে আর্টস। আবার একজন সেলসপারসন হয়তো প্রতিদিন ৪০ টি দোকান ভিজিট করে। বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য তাঁকে ৪০ এর জায়গায় ৪২ বা ৪৫টি দোকান ভিজিট করতে হবে। এভাবে সংখ্যায় হিসাব করার কারণে সেলসকে বলা হচ্ছে সাইন্স। রুট পরিকল্পনা, সময় বিবেচনা, পরিকল্পনাসহ অন্যান্য প্রতিটি ক্ষেত্রে কৌশলগত-বিজ্ঞানভিত্তিক বিবেচনা করে একজন সেলসপারসন কিভাবে তাঁর টাইম ম্যানেজমেন্ট করবে, কিভাবে স্বল্প সময়ে অধিক পরিমাণে কাজ করবে, কিভাবে তাঁর কাজের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করবে এই বিষয়গুলো খুঁজে বের করা, বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করা, বিষয়গুলো বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এসবই হচ্ছে সাইন্স বা বিজ্ঞান।

সাবেক ডিজিএম, মার্কেটিং ইস্পাহানি টি লিমিটেড।

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer