পর্ব- ৭
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মার্কেটিং কী এবং কেন প্রয়োজন?
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মার্কেটিংয়ের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো প্রশাসক কখনো তাঁর কোনো ইচ্ছে কারও ওপর চাপিয়ে দেন না| অথচ তিনি যা চান সেটাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়| এখানেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মার্কেটিংয়ের ক্যারিশমা| বিষয়টি খুব ইন্টারেস্টিং| প্রশাসক যা চাচ্ছেন সেটাই হচ্ছে, অথচ তিনি কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিচ্ছেন না| এখন প্রশ্ন হলো এটা কি করে সম্ভব? উত্তরটি খুব সহজ| তিনি যেকোনো বিষয় আলোচনার আগে সেটা নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণে হোমওয়ার্ক করেন এবং বিষয়টিকে মার্কেটিংয়ের দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করেন| অতঃপর তিনি তাঁর কাজের বেস্ট অপশনটি খুঁজে বের করেন| মিটিংয়ের সময় আলোচ্য বিষয়ের ওপর উপস্থিত সকল সদস্যদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করেন| সকলেই তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে আলোচ্য বিষয় নিয়ে কথা বলেন| আলোচকদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ তিনি যা ভেবেছেন তার অনুরূপ বা তাঁর চিন্তাধারার কাছাকাছি একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন| প্রশাসক মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন ওই প্রস্তাব তাঁর লক্ষ্য পূরণে সহায়ক কিনা| যদি সেটা তাঁর প্রস্তাবের অনুরূপ হয় তাহলে তিনি সেটা সমর্থন করে এবং অন্যান্যদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করেন| যদি ওই প্রস্তাব অবিকল তাঁর প্রস্তাবের মতো না হয় তাহলে তিনি সেখানে কিছুটা যোগ-বিয়োগ করেন| যোগ-বিয়োগ বা সংশোধন করার পর বাকিদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করেন| ফলে দেখা যায় তিনি যা চাচ্ছেন ঘুরেফিরে সেটাই বাস্তবায়ন হচ্ছে| একজন প্রশাসক যদি চৌকস এবং মেধাসম্পন্ন হন তাহলে তিনি সবসময় যেকোনো কাজের ফলাফলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন| কে কোন প্রস্তাব দিয়েছে, কার প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো, কারটা গ্রহণ করা হলো না এটা নিয়ে তিনি খুব বেশি চিন্তা-ভাবনা করেন না| তাঁর ভাবনায় থাকে তিনি যা চাচ্ছেন সেটা হচ্ছে কিনা| কারণ তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে লক্ষ্যে পৌঁছানো| আমি এ কারণেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মার্কেটিংয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করি|
অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্তের প্রতি আমার দুর্বলতা কাজ করে| আমি মনে করি যাঁদের নিয়ে আমি কাজ করি বা করব তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যে কোনো না কোনো বিষয়ের ওপর জ্ঞান, দক্ষতা, এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে| আমার ভাবনা যদি কারও ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে সেটাই বরং আমার কাজকে সামনের দিকে আরও এগিয়ে দেয়| এভাবে কাজ করার দুটি সুবিধা রয়েছে| প্রথমত, কেউ বলতে পারেনা আমি সকলের ওপর শুধু আমার মতামত বা ইচ্ছা চাপিয়ে দিচ্ছি| কারণ প্রস্তাবগুলো মিটিং থেকেই আসে, আমার দিক থেকে নয়| দ্বিতীয় সুবিধা হলো যাঁদের মধ্য থেকে প্রস্তাবগুলো আসে বা যাঁরা প্রস্তাবগুলো সমর্থণ করেন ওই প্রস্তাব যখন বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হয় তখন প্রস্তাবকারীরা ওই কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করেন| কারণ তাঁরা মনে করেন প্রস্তাবটি তাঁরাই দিয়েছেন| ফলে কাজে কোনো গাফিলতির রেশ খুঁজে পাওয়া যায় না| এখানে আমি আবারো বলব, একজন প্রশাসক হিসেবে যখন কোনো দায়িত্ব পালন করব তখন আমার প্রস্তাব যদি অন্য কারও মুখ দিয়ে বলাতে পারি তাহলে ওটা আমারই প্রস্তাব বা ভাবনা ছিল এটুকু হয়তো বলতে পারছি না, কিন্তু ওই প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে আমি যে লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছি, লক্ষ্য পূরণ করছি, প্রতিষ্ঠানকে ভালোর দিকে নিয়ে যাচ্ছি সেটা আমার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ|
কখনো কখনো আমাকে একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়| প্রশ্নকর্তা আমাকে বলেন, তাঁর তো পড়ালেখা মার্কেটিং নিয়ে নয়| কিন্তু তাঁর ইচ্ছে তাঁর কাজের মধ্যে যেন মার্কেটিংয়ের ছোঁয়া থাকে| সেক্ষেত্রে তিনি কি করতে পারেন| এমন প্রশ্নের সম্মুখীন যখন হই তখন তাঁদেরকে শুরুতেই একটি কথা মনে করিয়ে দিই, মার্কেটিং সব সময় ক্রেতাদের ¯^ার্থে কথা বলে, ক্রেতাদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার কথা বলে, ক্রেতা সন্তুষ্টির কথা বলে| অতএব আপনি যখন কোনো একটি কাজ করবেন, সেটা যে কাজই হোক না কেন, যদি ওই কাজের মাধ্যমে আপনি আপনার ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে পারেন, ক্রেতাদের ভালোলাগার বিষয়টি ˆতরি করতে পারেন, তাহলেই সেখানে মার্কেটিংয়ের ছোঁয়া থাকবে| একজন ক্লিনার যখন অফিসের ফ্লোর পরিষ্কার করছে তখন তাঁকে মনে রাখতে হবে তাঁর দুই ধরনের ক্রেতা বা কাস্টমার রয়েছে| একদিকে রয়েছে ইন্টারনাল কাস্টমার, অন্যদিকে রয়েছে এক্সটারনাল কাস্টমার| ইন্টারনাল কাস্টমার হলো তাঁর প্রতিষ্ঠানের টপ ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সকল সহকর্মী| অন্যদিকে এক্সটারনাল কাস্টমার হলো ওই প্রতিষ্ঠানে বাইরে থেকে যাঁরা আসছেন| তাঁরা ক্রেতা হোক বা ভিজিটর হোক সকলেই এক্সটারনাল কাস্টমার| ক্লিনারের দায়িত্ব হলো অফিস এমনভাবে ক্লিন করা যেন অফিসের ভেতরের এবং বাইরের সকল কাস্টমারের কাছে সেটা পছন্দসই হয়| কাস্টমার বা ভিজিটর কারও কাছেই যেন সেটা অপছন্দনীয় না হয়| সকলে যেন কাজের প্রশংসা করে| অফিস ক্লিন করার সময় কোনো কাস্টমার যেন তাঁর কাজের কারণে বিরক্ত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে| বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে “অর্ডার কালচার” অনুসরণ করতে দেখা যায়| প্রতিষ্ঠানগুলোতে “সেল” প্র্যাকটিস করা হয়| কিন্তু হওয়া উচিৎ মার্কেটিং প্র্যাকটিস| এ কারণেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মার্কেটিংকে আমি এতো বেশি হাইলাইট করি|
(সমাপ্ত)
অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম
ভাইস চ্যান্সেলর
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়
সাবেক চেয়ারম্যান
মার্কেটিং বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ভাইস চ্যান্সেলর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক চেয়ারম্যান মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়