ইনোভেশন না থাকলে হারিয়ে যায় ব্র্যান্ড
সময়ের সাথে বদলানোই টিকে থাকার একমাত্র পথ
পৃথিবীতে এমন অনেক ব্র্যান্ড আছে যাদের নাম একসময় মানুষের মুখে মুখে ফিরত। মানুষ তাদের বিশ্বাস করত, ভালোবাসত, ব্যবহার করত। বাজারে তাদের আধিপত্য ছিল এতটাই শক্তিশালী যে মনে হতো এই ব্র্যান্ডগুলো কখনো হারিয়ে যাবে না। কিন্তু সময়ের সাথে বাস্তবতা বদলেছে। আজ সেই অনেক ব্র্যান্ড ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে শুধু একটি বড় ভুলের কারণে। আর সেই ভুলটি হলো, সময়ের সাথে নিজেকে পরিবর্তন না করা। ব্যবসা জগতে একটি বড় সত্য হলো যে বদলাতে পারে, সেই বাঁচে। আর যে থেমে যায়, সে হারিয়ে যায়। একটি পণ্য বাজারে জনপ্রিয় হওয়া খুব কঠিন। কিন্তু তার চেয়েও কঠিন হলো সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা। কারণ বাজার কখনো স্থির থাকে না। মানুষের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলায়। আজ মানুষ যা চায়, কাল হয়তো তা বদলে যাবে। নতুন প্রযুক্তি আসবে, নতুন প্রতিযোগী আসবে, নতুন চিন্তা আসবে। এই পরিবর্তনের মধ্যে যে প্রতিষ্ঠান নিজের পণ্যকে উন্নত করবে, তারাই টিকে থাকবে।
একসময় নোকিয়া ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় মোবাইল ব্র্যান্ড। এমন একটা সময় ছিল যখন মোবাইল মানেই নোকিয়া। মানুষের হাতে হাতে নোকিয়া ছিল। কিন্তু স্মার্টফোন যুগে যখন অ্যান্ড্রয়েড বাজারে এলো, নোকিয়া সেই পরিবর্তনকে দ্রুত গ্রহণ করতে পারেনি। তারা তাদের পুরোনো অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে পড়ে রইল। ফলাফল আজ নোকিয়া আগের অবস্থানে নেই। এখানে শিক্ষা একটাই আপনি যত বড়ই হোন, সময়ের সাথে না বদলালে বাজার আপনাকে ক্ষমা করবে না।
একই ঘটনা ঘটেছে কোডাক এর সাথে। একসময় ফটোগ্রাফির রাজা ছিল কোডাক। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রযুক্তি প্রথম কোডাক-ই আবিস্কার করেছিল। কিন্তু তারা ভয় পেয়েছিল, ডিজিটাল প্রযুক্তি এলে তাদের ফিল্ম বিজনেস ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তারা পরিবর্তনকে আটকে রাখার চেষ্টা করেছে। আর সেই সুযোগে অন্যরা বাজার দখল করেছে। আজ কোডাক আর আগের কোডাক নেই। ব্ল্যাকবেরি লিমিটেড-এর গল্পও একই। কর্পোরেট জগতে ব্ল্যাকবেরি ছিল সম্মানের প্রতীক। সিকিউরিটি, ই-মেইল সিস্টেম সব দিক থেকে তারা সেরা ছিল। কিন্তু টাচস্ক্রিন ট্রেন্ড, অ্যাপ ইকোসিস্টেম, ইউজার ফ্রেন্ডলি ইনোভেশন-এ পিছিয়ে পড়েছিল। ফলাফল মানুষ অন্যদিকে চলে গেছে। এই উদাহরণগুলো শুধু বিদেশে নয়, আমাদের দেশেও আছে।
বাংলাদেশে একসময় অ্যারোমেটিক বিউটি সোপ ছিল খুবই পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি নাম। বাজারে তাদের শক্ত অবস্থান ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে ক্রেতাদের প্রত্যাশা বা চাহিদা বদলেছে। মানুষ শুধু সাবান নয়, ফ্র্যাগর্যান্স, স্কিন কেয়ার, বিউটি পজিশনিং সব কিছু চেয়েছে। সেখানে অ্যারোমেটিক নতুনত্ব আনতে পারেনি। প্যাকেজিং-এ মডার্ন টাচ আনতে পারেনি। মার্কেটিং কমিউনিকেশনে ফ্রেশনেস আনতে পারেনি। ফলে বাজার থেকে ধীরে ধীরে সরে গেছে। একইভাবে ক্যামেলিয়া বিউটি সোপ-এর অবস্থাও একই রকম হয়েছে। ভালো ব্র্যান্ড ছিল, কিন্তু ইনোভেশন থেমে গিয়েছিল। বাজারে যখন নতুন নতুন ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রোডাক্ট এলো, ক্রেতাদের পছন্দও তখন বদলে গেল। এখানেই বুঝতে হবে বাজার লয়্যালটি দিয়ে চলে না, ভ্যালু দিয়ে চলে। মানুষ ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা সবসময় ভালোটার দিকেই যায়। আপনি যদি আজ ভালো থাকেন কিন্তু আগামীকাল যদি প্রতিযোগি আরও ভালো কিছু দেয়, ক্রেতারা তার দিকেই যাবে। বিশেষ করে এখনকার সময়টা ইনোভেশন-ড্রিভেন। আজকের বাজারে শুধু পণ্য বানালেই হবে না। পণ্যকে ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন করতে হবে। টেস্ট আপগ্রেড করতে হবে, ফর্মুলা উন্নত করতে হবে, প্যাকেজিং আধুনিক করতে হবে, কোয়ালিটি সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে এফএমসিজি, হেলথকেয়ার সেক্টরে এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ক্রেতা শুধু পণ্য কেনে না; তাঁরা বিশ্বাস কেনে।
একটি বেবি ফুড ব্র্যান্ড যদি ৫ বছর আগের ফর্মুলা নিয়ে আজও বাজারে থাকে, আর তার প্রতিযোগী যদি গবেষণা-নির্ভর নতুন ফর্মুলা নিয়ে আসে যেখানে প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক, ডাইজেশন, ব্রেন ডেভেলপমেন্ট এর মতো বিষয়গুলোতে উন্নত কিছু থাকে তাহলে মা-বাবারা স্বাভাবিকভাবেই নতুন পণ্যের দিকে ঝুঁকবে। কারণ পিতামাতার সিদ্ধান্ত অনেক সময় আবেগ নির্ভর এবং বিশ^াস দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই নিউট্রিশন মার্কেট-এ ইনোভেশন মানে শুধু বিজনেস গ্রোথ না; ইনোভেশন মানে টিকে থাকা। আজ যারা প্রোডাক্ট ইনোভেশনে বিনিয়োগ করছে, আগামী দিনের মার্কেট তাদের।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইনোভেশন মানেই সবসময় পণ্য পরিবর্তন না। ইনোভেশন হতে পারে ফর্মুলা ইমপ্রোভমেন্ট, উন্নত প্যাকেজিং, উন্নত মূল্য নির্ধারণ কৌশল, উন্নত সাপ্লাই চেইন, ক্রেতাদের অধিকতর সুবিধা প্রদান, ভালো ডাক্তারদের সাথে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, উন্নত ব্র্যান্ডিং কৌশল ইত্যাদি নিয়েও।
একটি ছোট পরিবর্তনও বাজারে অনেক সময় বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে। একটি মিল্ক পাউডার ব্র্যান্ড যদি শুধু টেস্ট ইমপ্রোভ করে হজম ক্ষমতা বাড়ায় এবং আকর্ষণীয় টিনে প্যাকেজিং করে তাহলে এটাও মার্কেটে নাটকীয় পরিবর্তন হতে পারে। আজকের ক্রেতারা অনেক সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট, ডক্টরস অ্যাডভাইস, পিয়ার ফিডব্যাক সব কিছু মিলে ক্রয় সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ব্র্যান্ড এর স্থির থাকার সুযোগ নেই।
বাস্তবতা হলো, বাজার কাউকে চিরদিনের জন্য জায়গা দেয় না। আপনি আজ মার্কেট লিডার, কিন্তু আগামীকাল যদি নতুন প্রজন্মের চাহিদা বুঝতে না পারেন, তাহলে আপনি ফলোয়ার হয়ে যাবেন। এ কারণেই বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বছরে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পেছনে। কারণ তারা জানে ইনোভেশন ছাড়া ভবিষ্যৎ নেই। একটি ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় শত্রু প্রতিযোগী নয়; সবচেয়ে বড় শত্রু হলো আত্মতুষ্টি অর্থাৎ “আমরা তো ভালোই আছি” এই মাইন্ডসেট। যেদিন একটি কোম্পানি ভাববে, তার পণ্য যথার্থ এবং আর উন্নতির দরকার নেই, সেদিন থেকেই তার পতন শুরু হবে। আজকের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে তিনটি বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত, বাজারের পালস বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত, কনজ্যুমার ফিডব্যাক শুনতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়মিত আপগ্রেড করতে হবে। কারণ ব্র্যান্ডের ভ্যালু শুধু তার অতীত দিয়ে বিচার হয় না; তার ভবিষ্যতের প্রস্তুতি দিয়েও বিচার হয়। যে প্রতিষ্ঠান আজ পরিবর্তনের সাহস করবে, নতুনত্ব আনবে, কোয়ালিটিতে বিনিয়োগ করবে এবং ক্রেতাদের বিশ^াসকে অগ্রাধিকার দেবে আগামী দিনের বাজার তার হাতেই থাকবে। সবশেষে একটি কথাই বলা যায়, ইনোভেশন কোনো অপশন নয়; এটি এখন ব্যবসা জগতে বেঁচে থাকার শর্ত। কারণ সময়ের সাথে যে এগোয়, বাজার তার। আর যে থেমে যায়, ইতিহাস তার।